ব্যস, এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারত কারিনা কায়সারের মৃত্যুর ঘটনাটা।
যেকোনো মৃত্যুই শোকের। আর প্রিয়জনদের কাছে শোক ছাপিয়ে বেদনা, ভীতি, আশা-নিরাশার দোলাচাল আর অসহায়ত্বের মিশেলে অবর্ণনীয় অনুভূতি। শোকসন্তপ্ত পরিবারটির প্রতি দল-মত নির্বিশেষে আন্তরিক সমবেদনাই প্রত্যাশিত। কারণ, শরীরে বাসা বাধার আগে রোগ-শোক কারও দলমত যাচাই করে না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কারিনার মৃত্যু হয়ে উঠল একটা দ্বন্দ্বের বিষয়! সম্ভবত জীবিতাবস্থায়ও তিনি এতটা চর্চিত ছিলেন না। তাকে ঘিরেও রাজনীতি হতে পারে, এ কথা হয়ত ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি!
সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই কারিনার অসুস্থতার খবর খুব দ্রুতই জেনে যায় সবাই। সমবেদনা জানিয়ে প্রচুর মানুষ তার জন্য প্রার্থনা করেন। বিপরীত দিকে আরেকদল মানুষ মেতে ওঠে কুৎসিত উল্লাসে, তার অসুস্থতাকে বানায় রাজনীতির হাতিয়ার। আমরা একদল গুপ্ত রাজনৈতিক দুর্বৃত্তকে দেখেছি জাতিবিদ্বেষ উসকে দিতে, আরেকটি দলকে দেখেছি সমানে শাপ-শাপান্ত করতে। আর "বোনাস" হিসেবে স্রেফ নারী হওয়ায় বডিশেমিং, গালিগালাজ তো ছিলই!
ফলে কারিনার মৃত্যুকে ছাপিয়ে ট্র্যাজেডি হয়ে উঠেছে আমাদের সমাজটা আসলে কোনদিকে যাচ্ছে?
রোগ শরীরে, পচন সমাজে?
এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের (অ)কল্যাণে শোক আর বেদনার মতো একান্ত অনুভূতিগুলোও এখন মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই তো এক যুগ আগেও আপনজন, আস্থাভাজন আর চিকিৎসক ছাড়া অসুস্থতার কথা জনে জনে জানিয়ে বেড়ানোর মতো বিষয় ছিল না। কিন্তু এখন! মোটামুটি পরিচিতি আছে এমন কারও অসুস্থতাও হয়ে উঠেছে জনচর্চার বিষয়। অপারেশন নাকি ইনজেকশন- সে নিয়েও সবার মতামত আর মন্তব্য। আর সঙ্গে ধেয়ে আসে কে, কবে, কোথায়, কীভাবে কী করেছিল সেসবের ফিরিস্তি, বাছবিচার আর চুলচেরা বিশ্লেষণ। শুরু হয় বয়ানের এক অসুস্থ খেলা।
কারিনার জন্য কিন্তু অনেকেই একদম মন থেকে শুভকামনা জানিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের সুযোগসন্ধানী অনলাইন সন্ত্রাসীরা খুব দ্রুতই তার অসুস্থতাকে পুঁজি করে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের স্বার্থে। কবে, কোথায়, কী করেছিলেন সেসব টেনে তুলে একজন মৃত্যুপথযাত্রীকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা। আরেকদল আবার আরও কয়েকধাপ এগিয়ে মুখ-চোখ ঢেকে বলতে চেষ্টা করল, "কারিনা আপুকে ওই দেশে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না!" একটা রক্ত-মাংসের মানুষ থেকে তিনি হয়ে উঠলেন ভার্চুয়াল হাতিয়ার।
ধীরে ধীরে পুরো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে মানবিকতা উধাও হয়ে হাজির হল বয়ানের রাজনীতি! নিজ দেশের মানুষ যখন এসব করছে, তখন সেদেশের ইনফ্লুয়েন্সাররা শুভকামনা জানিয়ে বললেন, "অতিথি ভগবান।" আফসোস! এই অপ্রত্যাশিত আন্তরিকতা কারিনা দেখে যেতে পারলেন না।
কেন এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব?
এই প্রশ্নের উত্তর একটি ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানের আধুনিক তত্ত্বমতে- মানুষ কেবল তার প্রতিপক্ষের সঙ্গে দ্বিমতই করে না, তারা ধীরে ধীরে তাদের নৈতিকভাবে ঘৃণা করতে শুরু করে। যাকে মনোবিজ্ঞানীরা বলেন ‘আবেগতাড়িত মেরুকরণ’। কখনো কখনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় কেবল তার পছন্দের বিষয় থাকে না, হয়ে ওঠে আদর্শিক পরিচয়। এমতাবস্থায় মানুষ ভুলে যায় প্রতিপক্ষ তারই মতো একজন। তারও নিজস্ব মত, চিন্তা, আদর্শিক অবস্থান থাকতে পারে। বরং সে মনে করে ‘শত্রুর সঙ্গে অন্যায় হলেও ঠিকই আছে!’
একটি বড় অংশের মানুষ এভাবে চিন্তা করতে থাকলে সমাজ থেকে সহমর্মিতা হারিয়ে যায়। আর এ কারণেই রোগ-শোক-জরার ঊর্ধ্বে ঠাঁই পায় কথিত আদর্শিক অবস্থান। প্রশ্ন জাগে, যে আদর্শ মানুষের দুর্দশাকে পুঁজে করে, তা কতখানি মানবিক?
মুখ লুকাতে গর্ত খোড়ার কষ্টটুকুও না থাকায় এমন উগ্র ও অমানবিক আচরণ অনলাইনে করা সহজ। সে কারণে ছাপোষা মানুষকেও পরিচয় লুকিয়ে অনলাইনে ভয়ংকর আচরণ করতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠেছে ঘৃণাচর্চার আদর্শ ক্ষেত্র। বর্তমানে ইন্টারনেট হয়ে উঠেছে নিষ্ঠুর মনোবৃত্তি চর্চার এক অবাধ ক্ষেত্র।
বিষয়টিকে ‘নৈতিক বিচ্যুতি’ বললেও অত্যুক্তি হয় না। কারণ, আক্রমণকারীরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, ‘ওর (ভুক্তভোগী) এটাই প্রাপ্য।’ কারিনার ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, ‘সে অন্যায়কারীদের সমর্থক ছিল’, ‘তার পরিবার ওইসব করেছে’, ‘সে তো এসব বলে বেড়াত’, অথবা ‘সে নিজেই নিজেকে এখানে টেনে নামিয়েছে’- এ ধরনের মন্তব্যের ছড়াছড়ি।
অর্থাৎ, প্রথমে আক্রমণকারীরা নিজেদের নিষ্ঠুরতাকে ‘প্রাপ্য’ হিসেবে সাব্যস্ত করেছে। এতে হেনস্তা করা তাদের জন্য হয়ে উঠেছে মনস্তাত্ত্বিকভাবে সহজতর।
লিঙ্গ বৈষম্য : এড়িয়ে যাওয়াতেই স্বস্তি
নারীর প্রতি আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি প্রচণ্ড মাত্রায় অসহিষ্ণু ও আক্রমণাত্মক- এই সত্য মেনে না নিলে কারিনার ঘটনাটি সঠিকভাবে উপলব্ধি করা যাবে না। বাংলাদেশের নারী কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের প্রত্যেকেই কেবল সমালোচনা না, রীতিমতো গণ-হেনস্তার শিকার হন প্রতিদিন।
একজন পুরুষ কন্টেন্ট নির্মাতা হয়ত তার রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে আক্রমণের শিকার হতে পারেন। কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে এই আক্রমণ- রাজনৈতিক, নৈতিক, শারীরিক, সামাজিক এমনকি যৌন হেনস্তা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। একজন নারীকে তার গায়ের রং, পোশাক, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, কণ্ঠস্বর এবং সর্বোপরি অনলাইনে উপস্থিতির জন্য অবর্ণনীয় আক্রমণ সইতে হয় কমেন্ট, ইনবক্স এমনকি অন্যের কন্টেন্টে। মনে রাখতে হবে, নারীবিদ্বেষ কেবল পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়। আক্রমণকারীরা তীব্রভাবে বিশ্বাস করে, অনলাইনে নারীদের ঠাঁই নেই! তাই ‘তোমার সঙ্গে একমত নই’-এর বদলে দেখা যায় ‘মেয়ে মানুষের কন্টেন্ট বানানোর দরকার কী?’।
সহমর্মিতার চেয়েও রাজনীতি বড়?
কারিনার অসুস্থতার সময়টাতে আমাদের সামনে এসেছে বিবাদমান দুটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কদর্য রূপ। একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষ, একটি শোকার্ত পরিবার, উদ্বিগ্ন শুভাকাঙ্ক্ষী সবাই যেন গৌণ হয়ে গেলেন রাজনৈতিক বয়ানের সামনে। হারিয়ে গেল মানবতা, সহমর্মিতা। মুমূর্ষ রোগী কোন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন, তা নিয়েও ‘রাজনীতি’ হলে তখন তা আর কোনো সাধারণ ঘটনা থাকে না। হয়ে ওঠে মতাদর্শিক দ্বন্দ্বের বিষয়বস্তু।
জনমানসে বিপর্যয়
এর আগেও আমরা বিভিন্ন ঘটনায় দেখেছি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জনগণের চিন্তাভাবনা যুক্তির পরিবর্তে আবেগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আর এখন সোশ্যাল মিডিয়া যেন এক সার্বক্ষণিক জনসমাবেশ। এখানে অন্যকে হেয় করতেই ব্যস্ত সবাই। অ্যালগরিদমও আক্রমণাত্মক কন্টেন্টগুলোকে অস্বাভাবিক দ্রুততায় ছড়াতে থাকে। কারণ প্ল্যাটফর্মগুলোর চাই ব্যবসা। অন্যদিকে, সুপরামর্শ কিংবা সৌহার্দ্যের বার্তা অ্যালগরিদমের কাছে অতটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু না।
এমনটাই চলতে থাকলে...
এই সংঘাতপূর্ণ মনোবৃত্তির চর্চা থামানো প্রয়োজন অবিলম্বে। প্রথমত, এতে করে ধীরে ধীরে সমাজে নিষ্ঠুরতা স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। একজনের কষ্টে সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর বিকৃত উল্লাস সমাজের মানবিকতায় চিড় ধরায়। ফলে ভয়াবহ ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে লোকের গা সওয়া হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতি হেনস্তার নামান্তর হয়ে উঠলে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, রাজনীতি, অ্যাক্টিভিজমসহ সমস্ত ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ কমতে শুরু করবে।
তৃতীয়ত, এই সার্বক্ষণিক দ্বন্দ্ব রাজনৈতিক উগ্রতাকে উসকে দেয়। প্রতিপক্ষের প্রতি ন্যূনতম সৌজন্যবোধ, শিষ্টাচার না থাকলে রাজনৈতিক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদিও বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মানেই যেন চিরশত্রু!
প্রতিরোধ কোন উপায়ে?
এককথায় এই মহামারির কোনো সহজ সমাধান নেই। তবে প্রথমেই প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। প্রতিপক্ষ হলেও তার প্রতি অমানবিক হওয়া যাবে না কিছুতেই। পরিতাপের বিষয় হলো, উপমহাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম বড় হাতিয়ার জনরোষ। কিন্তু সমাজে দ্বন্দ্ব-সংঘাত কমিয়ে আনাও রাজনীতিবীদদের প্রধানতম দায়িত্ব। রাজনৈতিক বিরোধ মানে মানবতার বিলোপ নয়।
প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। প্রত্যেকেই আজ ভার্চুয়াল জগতের বাসিন্দা। তাই ডিজিটাল লিটারেসি বাড়ানোর বিকল্প নেই। তাই প্রত্যেককেই তথ্য আর প্রোপাগান্ডার মধ্যে পার্থক্য জানতে হবে। বুঝে নিতে হবে তাদের আবেগ নিয়ে খেলার জন্য বসে আছে অসংখ্য দুষ্টচক্র।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর কেবল রিচ আর বিজ্ঞাপনে মনোযোগী না হয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে দায়িত্বশীল আচরণ করা জরুরি। বিশেষ করে সাম্প্রদায়িক সংঘাত, নারী ও শিশু ইস্যুতে তাদের অ্যালগরিদম যেন সত্যিকারার্থেই কল্যাণকর হয়।
কটূবাক্যবাণে জর্জরিত না করেও যে দ্বিমত পোষণ করা সম্ভব- নাগরিক সমাজে এই উপলব্ধির অনুধাবন জরুরি। বিতর্কিত ব্যক্তিও সামাজিক সহমর্মিতার দাবিদার।
শেষকথা
জনপ্রিয়দের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমাজের মানবিকতা আন্দাজ করা যায় না, দেখতে হয় সে আসলে অপছন্দের ব্যক্তিদের প্রতি কতটা মানবিক। একটি তাজা প্রাণের অকালমৃত্যু। জীবদ্দশায় তার সঙ্গে লোকের মিল-অমিল ছিল, অনেকে তাকে পছন্দ করত আবার অনেকে করত না, এমনকি তার রাজনৈতিক দর্শন নিয়েও হয়ত বিতর্ক ছিল। কিন্তু এসবের কিছুই মানবিকতার ঊর্ধ্বে নয়।
যদি কারও অসুস্থতা বিনোদনের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে, যদি শোক হয়ে ওঠে প্রোপাগান্ডার নামান্তর, আর মৃত্যু হয়ে ওঠে মতাদর্শিক লড়াইয়ের হাতিয়ার- তাহলে বলতেই হয় আমরা নিজের ভেতরে থাকা সুন্দর মানুষটাকেই মেরে ফেলেছি।
/লেখকের নিজস্ব অভিমত/