যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলায় মৃত্যু ও ধ্বংস নেমে এসেছে। এতে তেহরানের সরকার কেঁপে উঠেছে, কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত হয়নি। হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিলেন সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিও। তার জায়গায় তার ছেলে দায়িত্ব নিয়েছেন, যাকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মনে করেন।
সরকার পরিবর্তনই ছিল পরিকল্পনা। কিন্তু ট্রাম্পের জন্য পরিকল্পনা বদলানো শাসনব্যবস্থা বদলানোর চেয়ে অনেক সহজ। যা শুরু হয়েছিল ইসলামী বিপ্লবের কয়েক দশকের প্রভাব পেছনে ঠেলে দেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার হিসেবে, তা এখন নেমে এসেছে ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে নিষ্ক্রিয় করার এক ‘স্বল্পমেয়াদি অভিযানে’।
ট্রাম্প এখনো পুরোপুরি ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড’ বলেননি। বলছেন তিনি জিতেছেন, আবার এটাও বলছেন, তার আরও জেতার বাকি আছে। এটি সেই পরিচিত পর্যায়, যখন কথার জোর একটু কমিয়ে আনা হয়, কারণ ধীরে ধীরে বোঝা যায় সমস্যা আসলে প্রেসিডেন্ট প্রথমে যতটা ভেবেছিলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। জটিলতা ট্রাম্পের খেয়াল-খুশির বশ মানে না। আর সেটি তাকে বিরক্ত করে।
ইরান যে ভেনেজুয়েলার মতো নয়, তা এখন স্পষ্ট। তবে উপরিভাগে দেখলে দুটিকে একই রকম মনে হতে পারে, কারণ দুটিই জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে দুটিরই বৈরী সম্পর্কের ইতিহাস আছে। এ বছরের শুরুতে কারাকাস থেকে নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে তার অনুগত ভাইস প্রেসিডেন্টকে বসিয়ে দেওয়ার যে মডেল ট্রাম্প দেখেছিলেন, সেটি তাকে ইরানেও একই ধরনের কিছু করার ইচ্ছা জুগিয়েছিল। কিন্তু ইসলামী প্রজাতন্ত্রের হাতে আদর্শিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার এমন ভান্ডার আছে, যা সহজে ভাঙা যায় না। পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যপথকে হুমকির মুখে ফেলে তারা আন্তর্জাতিক বাজারকেও কাঁপিয়ে দিতে পারে।
হোয়াইট হাউস মনে হয় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের একেবারেই অনুমেয় অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়াগুলো আগে বুঝতে পারেনি। তেলের দাম আকাশছোঁয়া হওয়া, শেয়ারবাজার পড়ে যাওয়া, সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া, যার ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে এবং প্রবৃদ্ধি থমকে যায়। অর্থনৈতিক সূচকে বিপদের লাল সংকেতই সম্ভবত ট্রাম্পকে তার সামরিক অভিযান দ্রুত শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করেছে। একটি নীরব সমঝোতার আভাসও দেখা যাচ্ছে। স্বাধীনতার কথা এখন থাক। ইরানিদের ওপর দমন-পীড়ন চলতেই পারে, যতক্ষণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত না হয়।
আবারও সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা হতে পারে। কিন্তু লক্ষ্য ছোট করে ফেলার সিদ্ধান্তে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। এটাই ট্রাম্পের পদ্ধতি। তার তথাকথিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কনীতিতেও সেটি দেখা গেছে। প্রথমে শুল্ক অনেক বাড়ানো হয়েছিল, পরে বৈশ্বিক বাজারে আতঙ্ক কমাতে কিছুটা নামিয়ে আনা হয়। গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির ক্ষেত্রেও একই ধারা দেখা গেছে। প্রথমে খুব কড়া ভাষায় বলা হয়েছিল, পরে ইউরোপীয় মিত্রদের চাপের মুখে সুর নরম হয়। এ প্রবণতা এতটাই প্রতিষ্ঠিত যে, এর একটি সংক্ষিপ্ত নামও তৈরি হয়েছে। টাকো। অর্থাৎ ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যান। তবে এতে মনে হতে পারে, তিনি খারাপ ধারণা থেকে পুরোপুরি সরে আসেন, যা আসলে পুরো সত্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রে গড় শুল্কহার এখনো গত একশ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আছে। গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায্য অধিকার, এ দাবিও প্রত্যাহার করা হয়নি। ইউরোপীয় গণতান্ত্রিক দেশগুলো যে অভিন্ন অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে বলে ভাবত, সেই জমিন এখন সন্দেহে ও অবিশ্বাসে ক্ষতবিক্ষত। ক্ষমতার এমন প্রতিটি আত্মম্ভরী প্রদর্শন আস্থা নষ্ট করে এবং আলোচনার মাধ্যমে মতভেদ মেটানোর আন্তর্জাতিক কাঠামোকেও দুর্বল করে দেয়।
অপারেশন এপিক ফিউরির সবচেয়ে বড় অযোদ্ধা সুবিধাভোগী হচ্ছেন ভ্লাদিমির পুতিন। উঁচু জ্বালানি দামের কারণে তার দুর্বল অর্থনীতি কিছুটা স্বস্তি পাবে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে ওয়াশিংটন ভারতকে রুশ তেল কেনার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের দিকে ইরানের টানা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যে মজুত কমছে, তা ইউক্রেনেরও দরকার ছিল। তবে ক্রেমলিনের জন্য সবই সুখকর নয়। পুতিনের অস্ত্রভান্ডারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইরানি ড্রোন, যা এখন মস্কোয় না গিয়ে নিজ দেশের প্রয়োজনে ব্যবহার হতে পারে। আর বহুদিনের মিত্র একটানা আকাশ হামলার শিকার হচ্ছে, অথচ তিনি অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। রুশ প্রেসিডেন্টের জন্য এটি অপমানজনক।
দীর্ঘমেয়াদে পুতিনের জন্য লাভের জায়গা আরও বড়। কারণ এ যুদ্ধ সেই ভূরাজনৈতিক মতবাদকে শক্তিশালী করে, যার মূল কথা হলো বড় দেশগুলো যেসব দেশের ওপর ক্ষুব্ধ, তাদের সঙ্গে যা খুশি তাই করতে পারে। কিয়েভে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা চালানোর সময় ক্রেমলিন ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বের তোয়াক্কা করেনি। এখন ওয়াশিংটনকে তেহরানের ক্ষেত্রে একই অবস্থান নিতে দেখে তারা নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট। এ দুই ঘটনার মধ্যে পার্থক্য আছে, তা ন্যূনতম নৈতিক বোধসম্পন্ন যে কারও কাছেই স্পষ্ট হওয়ার কথা। ইউক্রেন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যাকে তার স্বাধীন বাণিজ্য ও নিরাপত্তানীতি প্রতিষ্ঠার সাহস দেখানোর কারণে একটি স্বৈরাচারী প্রতিবেশী আক্রমণ করেছে। ইরান একটি একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যা নিজের নাগরিকদের হত্যা করে এবং বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাস ছড়ায়।
পুতিনের ভুয়া নৈতিক সমতাকরণের যুক্তি খণ্ডনের জন্য এ পার্থক্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ট্রাম্পের যুদ্ধকে ন্যায্য প্রমাণ করার জন্য এগুলো যথেষ্ট নয়। আসন্ন ইরানি হামলার মুখে আত্মরক্ষার দাবি সমর্থন করার মতো কোনো প্রমাণও নেই। ইরানের শাসকদের নিষ্ঠুরতা স্বীকার করা, তাদের কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র হাতে পেতে না দেওয়ার ইচ্ছা রাখা এবং তারপর সরাসরি এ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যে, একমাত্র সমাধান এখনই যুদ্ধ, তাও আইনি অনুমোদন ছাড়া, এ দুটির মধ্যে একটি বড় ফাঁক আছে। কিয়ার স্টারমার যথার্থভাবেই সেই ঝাঁপ দিতে চাননি।
কিন্তু বিরোধীদলীয় নেত্রীর ক্ষেত্রে তা নয়। কেমি বাডেনক ইচ্ছেমতো দীর্ঘায়িত হতে পারে এমন সংঘাতে ব্রিটেনকে জড়াতে বেশ আগ্রহী। ট্রাম্পের অনুগ্রহ হারানোর ভয়ও তার আছে, তাই তিনি এত কুখ্যাত অবিশ্বস্ত এক প্রেসিডেন্টকে নিয়েও কোনো সতর্কতা দেখান না। তার মতে, প্রধানমন্ত্রী শুধু সামরিক সহায়তাই নয়, ট্রাম্পের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যও দেখাতে বাধ্য। নাইজেল ফারাজও শুরুতে একইভাবে যুদ্ধপন্থি ছিলেন। তবে রিফর্ম ইউকের নেতা জনমতের ভাষা বেশ ভালোই বোঝেন, তাই পরে তার অবস্থান কিছুটা সংশয়ী সুরে বদলে গেছে।
অন্ধ আমেরিকাপন্থি অবস্থানটি বাস্তববাদী রাজনীতির দোহাই দিয়ে শুনতে সম্মানজনক মনে হতে পারে। বলা যেতে পারে, যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিন ধরে নিজের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করেছে। তাই প্রতিদান দেওয়ার সময় এলে এত হিসাব কষার কিছু নেই। কিন্তু এ যুক্তি ধরে নেয় যে, লন্ডন ও ওয়াশিংটনের স্বার্থের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, অথবা থাকলেও তা এত বড় নয় যে, স্টারমার কখনো ট্রাম্পকে না বলতে পারেন।
বর্তমানে যারা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ করছেন, তাদের অনিয়মিত বিচারবুদ্ধি, আন্তর্জাতিক জোটের প্রতি অবজ্ঞা, প্রেসিডেন্টের ওপর আইনি নিয়ন্ত্রণের প্রতি ঘৃণা এবং এক ধরনের অতিদক্ষিণপন্থি, খ্রিষ্টান জাতীয়তাবাদী, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী আদর্শের প্রতি ঝোঁক বিবেচনায় নিলে, এমন মত ধরে রাখা কঠিন। এর সঙ্গে যদি এটাও ধরা হয় যে ট্রাম্পের এলোমেলো, অসংলগ্ন, প্রায় অশিক্ষিতসদৃশ জনসম্মুখের বক্তব্য হয়তো গুরুতর মানসিক অবক্ষয়ের লক্ষণ, তবে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে।
কনজারভেটিভ পার্টির সরকারি নীতি কি তাহলে এই যে, ব্রিটেনকে সবসময় এক দুর্নীতিগ্রস্ত আত্মমুগ্ধ ব্যক্তির খেয়াল-খুশির কাছে নতিস্বীকার করতে হবে, যার চারপাশে আছে অর্থলোভী, তোষামোদকারী আর উগ্র জাতীয়তাবাদী উন্মাদদের ভিড়? নাকি শুধু তখনই তাকে অনুসরণ করতে হবে, যখন তারা যুদ্ধের দামামা বাজায়? ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতির নকশা হিসেবে কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয়।
ট্রাম্পের মতবাদে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত অহংকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির সঙ্গে এক করে দেখা হয়। এতে ধরে নেওয়া হয়, আইনশৃঙ্খলার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এবং অর্থনৈতিক পরিণতির তোয়াক্কা না করেই একজন মানুষের সামরিক শক্তি প্রয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের গৌরব বাড়ায়। এতে ট্রাম্পের ক্ষমতার উৎস সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। কারণ, তা স্বীকার করলে মেনে নিতে হতো যে, তার ক্ষমতা অতীতের কাছেও ঋণী। তার আগের প্রেসিডেন্টদের কাছে, সংবিধানের কাছে, গণতান্ত্রিক মিত্রদের কাছে আর সেই অভিবাসীদের স্বাগত জানানোর ইতিহাসের কাছে, যারা আমেরিকান স্বপ্নের খোঁজে এসে এই দেশের অর্থনৈতিক প্রাণশক্তি বাড়িয়েছিল।
এটাই ম্যাগা রাজনীতির কেন্দ্রীয় মিথ্যা। ট্রাম্পকে মহান অনুভব করানোই আসলে আমেরিকার মহত্ত্বকে ধ্বংস করছে। নিজের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট তার দেশের বৈশ্বিক শক্তির ভিত্তিগুলোকেই দুর্বল করে দিচ্ছেন এবং মিত্রদেরও ক্ষতি করছেন। হোয়াইট হাউস প্রশাসনের প্রতি আনুগত্যকেই ব্রিটেনের জাতীয় স্বার্থ বলে সংজ্ঞায়িত করা একেবারেই হাস্যকর। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের নিজের জাতীয় স্বার্থই এখন সবচেয়ে বেশি পূরণ হতো যদি শাসন পরিবর্তন ওয়াশিংটনে ঘটত।
লেখক: গার্ডিয়ানের কলামিস্ট। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ