জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে অন্তত ৯টি ভোট প্রয়োজন। তবে শুধু প্রয়োজনীয় ভোট পেলেই হবে না, পাঁচ স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স ও রাশিয়ার কোনো একটি দেশের ভেটোও এড়াতে হবে।
নিরাপত্তা পরিষদ প্রার্থী বাছাইয়ের পর তার নাম সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের জন্য পাঠায়। ফলে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব কে হবেন, সে সিদ্ধান্তে বিশ্বের পাঁচ পরাশক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) প্রধান রেবেকা গ্রিনস্প্যান, আর্জেন্টিনার আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি, চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাচেলেট, ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা, গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বিরকেট, ইকুয়েডরের কূটনীতিক ইভোনে এ-বাকি, উগান্ডার ওলার অতুনু এবং সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল।
এক নজরে দেখে নিন প্রতিযোগীদের পরিচয়
রেবেকা গ্রিনস্প্যান
কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ৭০ বছর বয়সী গ্রিনস্প্যান বর্তমানে আঙ্কটাডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মহাসচিব পদে প্রচারণার জন্য তিনি সংস্থাটির দায়িত্ব থেকে সাময়িক ছুটি নিয়েছেন।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেনের শস্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে ‘ব্ল্যাক সি গ্রেইন ইনিশিয়েটিভ’ মধ্যস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
ইহুদি বাবা-মায়ের সন্তান গ্রিনস্প্যান তার পারিবারিক ইতিহাসও প্রচারণায় তুলে ধরছেন। তার দাবি, তার বাবা-মা হলোকাস্টে ‘কোনোভাবে বেঁচে গিয়ে’ পরে কোস্টারিকায় পাড়ি জমান।
মিশেল ব্যাচেলেট
চিলির সমাজতন্ত্রী ব্যাচেলেট দেশটির সাবেক স্বৈরশাসক অগাস্টো পিনোশের আমলে নির্যাতনের শিকার হন। ২০০৬ সালে তিনি চিলির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
পরে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে চীনের শিনজিয়াংয়ে উইঘুর মুসলিমদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় বেইজিংয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপড়েন তৈরি হয়।
৭৪ বছর বয়সী ব্যাচেলেট মনে করেন, বড় শক্তির চাপের মধ্যেও জাতিসংঘের মহাসচিবকে নৈতিক নেতৃত্ব দিতে হবে। মেক্সিকো ও ব্রাজিল তার প্রার্থিতাকে সমর্থন করেছে। তবে ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্ত দায়িত্ব নেওয়ার পর চিলি তার সমর্থন প্রত্যাহার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও ব্যাচেলেটের সমালোচনা করেছে, বিশেষ করে গর্ভপাতের অধিকারের পক্ষে তার অবস্থানের কারণে।
মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা
ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ৬১ বছর বয়সী এসপিনোসা জাতিসংঘকে বিশ্বের অভিন্ন সমস্যা মোকাবিলার একমাত্র সার্বজনীন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখেন। তবে তিনি জাতিসংঘের বড় ধরনের সংস্কারের পক্ষেও কথা বলেছেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাবেক প্রেসিডেন্ট এসপিনোসা সম্ভাব্য সংঘাতের আগাম লক্ষণ শনাক্ত করতে একটি ‘আর্লি ওয়ার্নিং’ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন।
তার প্রার্থিতায় অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার সমর্থন রয়েছে। তবে নিজের দেশ ইকুয়েডর তাকে সমর্থন করেনি।
রাফায়েল গ্রোসি
আর্জেন্টিনার ক্যারিয়ার কূটনীতিক ৬৫ বছর বয়সী রাফায়েল গ্রোসি ২০১৯ সাল থেকে আইএইএর মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার পরিচিতি বেড়েছে।
মহাসচিব পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও বর্তমান দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেননি গ্রোসি। তার ভাষায়, বর্তমান দায়িত্ব ছেড়ে নির্বাচনী প্রচারে নামা হবে ‘দায়িত্বে অবহেলা’।
পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করেন, জাতিসংঘ সংস্কারের বিষয়ে অন্যদের তুলনায় গ্রোসির অবস্থান বেশি দৃঢ়। মহাসচিবকে আরও সক্রিয়ভাবে ভূমিকা পালন করা উচিত বলেও মনে করেন তিনি।
ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বিরকেট
গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ৫২ বছর বয়সী রদ্রিগেস-বিরকেট বর্তমানে জাতিসংঘে দেশটির রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তার মতে, বৈশ্বিক মঞ্চে জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা জরুরি।
তিনি বলেন, শান্তি ও নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে জাতিসংঘকে মূল্যায়ন করা হলেও উন্নয়ন ও মানবাধিকারের মতো আরও অনেক ক্ষেত্রেই সংস্থাটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে।
ইভোনে এ-বাকি
ইকুয়েডরের কূটনীতিক ও রাজনীতিক ইভোনে এ-বাকির বয়স ৭৫ বছর। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ইকুয়েডরের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরিতে ভূমিকা রাখার জন্য পরিচিত।
টোঙ্গার মনোনীত এ-বাকির উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তিনি কাতারে ইকুয়েডরের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
লেবানিজ বাবা-মায়ের সন্তান এ-বাকি ১৯৯৫ সালে ইকুয়েডর ও পেরুর সীমান্ত সংঘাতের পর দুই দেশের মধ্যে সংলাপ এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখেন।
যুদ্ধের ভয়াবহতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, জাতিসংঘ সনদের যুদ্ধ থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি পুনরুজ্জীবিত করতে তিনি প্রস্তুত।
ম্যাকি সাল
৬৪ বছর বয়সী ম্যাকি সাল একমাত্র প্রার্থী, যিনি লাতিন আমেরিকার বাইরে থেকে এসেছেন। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী এবার লাতিন আমেরিকা থেকে পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাল শান্তি ও উন্নয়নের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছেন।
আফ্রিকান ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান বুরুন্ডি তার প্রার্থিতা প্রস্তাব করেছে। চলতি সপ্তাহে নিজ দেশ সেনেগালও তাকে সমর্থন দিয়েছে।
তবে ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সহিংস রাজনৈতিক বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব বিক্ষোভে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হয় বলে অভিযোগ করেছে সেনেগালের কর্তৃপক্ষ।
ওলার অতুনু
উগান্ডার ৭৫ বছর বয়সী ওলার অতুনু ১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ও শিশু এবং সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি ছিলেন।
এর আগে জাতিসংঘে উগান্ডার দূত এবং স্বল্প সময়ের জন্য দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
২০১১ সালের নির্বাচনে উগান্ডার বিরোধী দল উগান্ডা পিপলস কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন অতুনু। তবে দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট ইয়োওয়েরি মুসেভেনির কাছে পরাজিত হন তিনি।
সূত্র : ফ্রান্স টোয়েন্টি-ফোর