কথাগুলো বলছিলেন ভারত থেকে আসা শামসুল আলম। কোলে তার ছোট ছেলে আব্দুস সালাম। শিশুটির শুকিয়ে যাওয়া মুখ আর পানির জন্য কান্না যেন আরও অসহায় করে তুলেছে বাবাকে।
শনিবার (৬ জুন) বিকেলে পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের দক্ষিণ প্রধানপাড়া সীমান্তে শূন্যরেখার ওপারে ভারতের অভ্যন্তরে বসে এভাবেই আকুতি জানাচ্ছিলেন তিনি।
সেখানে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১০ জন মানুষ ৪০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে। বাংলাদেশে ‘পুশইন’ করার চেষ্টাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই পরিস্থিতির এখনো কোনো সমাধান হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
জানা গেছে, শুক্রবার ভোরে বড়বাড়ি বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। খবর পেয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় বিজিবির কঠোর অবস্থানের মুখে পুশ ইনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ফলে ওই ব্যক্তিরা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারেননি। এরপর থেকেই তারা শূন্যরেখার ওপারে ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থান করছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সীমান্তসংলগ্ন একটি কৃষিজমিতে নারী-পুরুষ ও শিশুরা খোলা আকাশের নিচে বসে আছেন। জমিতে জমে আছে পানি। কোথাও মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। শিশুদের মধ্যে দুজনের বয়স ছয় বছর এবং আরেকজনের বয়স নয় বছর। ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কাতর শিশুরা বারবার পানি চাইছে। তাদের কান্না থামাতে হিমশিম খাচ্ছেন বাবা-মায়েরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শুক্রবার রাতে এলাকায় মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির সময়ও নারী-শিশুসহ ওই ১০ জন একই স্থানে ছিলেন। তাদের জন্য কোনো ধরনের অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা ছিল না। রাতভর বৃষ্টিতে ভিজে কাটানোর পরও তাদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
ওই ১০ জনের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ, দুইজন নারী ও তিনজন শিশু রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে খোলা মাঠে অবস্থান করায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শিশুদের।
ঘটনার পর থেকে সীমান্ত এলাকায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। এ নিয়ে কোম্পানি ও ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে একাধিক পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও এখনো কোনো সমাধান আসেনি। শনিবার দুপুরে ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে প্রায় ২০ মিনিটের একটি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি।
নীলফামারী ব্যাটালিয়নের (৫৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, তিনি ৯৩ বিএসএফের কমান্ডারের সঙ্গে স্পট মিটিং করেছেন এবং ওই ব্যক্তিদের ফেরত নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে বিএসএফ দাবি করেছে, তারা বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ায় তাদের গ্রহণ করা সম্ভব নয়।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমি তাদের বলেছি, যেহেতু তারা ভারতের অভ্যন্তরে ছিল, আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করে ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের (আইসিপি) মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠানো উচিত। রাতের অন্ধকারে সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে এভাবে ফেলে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, ওই ব্যক্তিরা রাতভর বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে ছিলেন। তারা না খেয়ে কষ্ট পাচ্ছেন। এটি একটি অমানবিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আমরা বিএসএফকে বিষয়টি জানিয়েছি এবং তাদের ফেরত নেওয়ার অনুরোধ করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা রাজি হয়নি।
বিজিবির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, কোনো ধরনের পুশইন বাংলাদেশ গ্রহণ করবে না। যদি তারা বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকেন, তাহলে আন্তর্জাতিক আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তাদের ফেরত পাঠাতে হবে। তবে পুশইন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।