১৮৬২ সালে জন্মগ্রহণকারী গিরিজানাথ রায় ছিলেন দিনাজপুর রাজবংশের দশম উত্তরাধিকারী। রাজা তারকনাথ রায় ও রাণী শ্যামামোহিনীর দত্তক পুত্র হিসেবে তিনি রাজপরিবারে বেড়ে ওঠেন। শৈশবের শিক্ষা শুরু হয় রাজবাড়ীর পাঠশালায়। পরে কলকাতা ও ভূপালের রাজকুমার কলেজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। অল্প বয়সে জমিদারির উত্তরাধিকারী হলেও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁর পালক মাতা রাণী শ্যামামোহিনী দক্ষতার সঙ্গে জমিদারি পরিচালনা করেন।
শিক্ষা বিস্তারে গিরিজানাথ রায়ের অবদান দিনাজপুরবাসীর কাছে আজও স্মরণীয়। ১৮৮৭ সালে তিনি রাজবাড়ীর পাঠশালাকে উন্নীত করে মিডিল ভার্নাকুলার স্কুলে রূপান্তর করেন এবং রানী ভিক্টোরিয়ার গোল্ডেন জুবিলী উপলক্ষে বিদ্যালয়ের নামকরণ করেন ‘জুবিলী স্কুল’। পরবর্তীতে এটি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ে পরিণত হয়। ১৯১৩ সালে দিনাজপুর শহরের বালুবাড়ী এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন মহারাজা গিরিজানাথ উচ্চ বিদ্যালয়, যা এখনও অঞ্চলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
শুধু দিনাজপুরেই নয়, বৃহত্তর অঞ্চলের শিক্ষার উন্নয়নেও তিনি ভূমিকা রাখেন। রায়গঞ্জ হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান করেন এবং ১৯১২ সালে দিনাজপুর জেলা স্কুলের শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য লিয়ন হোস্টেল নির্মাণে অর্থ সহায়তা প্রদান করেন। তাঁর এসব উদ্যোগ শিক্ষার আলোকে আরও বিস্তৃত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
জনকল্যাণমূলক কাজেও তিনি ছিলেন অনন্য। শহরের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে গিরিজা ক্যানেল নির্মাণে বিপুল অর্থ অনুদান দেন। একই সঙ্গে ঘাঘেরা খালের সংস্কারেও উল্লেখযোগ্য অর্থ সহায়তা করেন। এসব উদ্যোগের ফলে নাগরিক জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে।
ব্রিটিশ শাসনামলে তিনি প্রশাসনিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। দিনাজপুর মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার ও তিনবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে নগর উন্নয়নে কাজ করেন। এছাড়া তিনি দিনাজপুর জেলা বোর্ডের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। প্রশাসনিক দক্ষতা ও জনসম্পৃক্ততার কারণে তিনি সমকালীন সমাজে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেন।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ প্রশ্নে তিনি ব্রিটিশ সরকারের অবস্থানকে সমর্থন করেছিলেন। এর স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯০৬ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘মহারাজা বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করে। যদিও এই অবস্থান নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে নানা আলোচনা রয়েছে, তবুও শিক্ষা ও জনকল্যাণে তাঁর অবদান নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই।
১৯১৯ সালে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং জনহিতকর উদ্যোগ আজও তাঁর স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। দিনাজপুরের ইতিহাসে মহারাজা গিরিজানাথ রায় কেবল একজন জমিদার নন; তিনি ছিলেন শিক্ষা, সমাজসেবা ও উন্নয়নের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।