ইমনের গল্পটি একার নয়। ইউরোপের দেশ গ্রিসে কাজের সুযোগ পেয়েও শুধু ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতায় যেতে পারছেন না অনেক বাংলাদেশি। একদিকে গ্রিক নিয়োগকর্তাদের কর্মী প্রয়োজন, অন্যদিকে বাংলাদেশে কাজের অপেক্ষায় রয়েছেন দক্ষ ও আগ্রহী মানুষ। মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়া। আর এই ব্যবধানের সুযোগ নিচ্ছে ফিলিপাইন, ভারত ও নেপালের মতো দেশ।
গ্রিসের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা যে কম নয়, তার ইঙ্গিত মিলছে নিয়োগের পরিসংখ্যানেই। গ্রিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ফিলিপাইন থেকে কর্মী পুনর্নিয়োগের সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৬৪৩। ২০২৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১০ হাজার ৬৭৯। একই সময়ে ভারত থেকে কর্মী পুনর্নিয়োগ ৭ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৯৪৭। নেপাল থেকেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী নিচ্ছে দেশটি।
অথচ বাংলাদেশ ও গ্রিসের মধ্যে শ্রমিক নিয়োগের সমঝোতা রয়েছে। ২০২২ সালে দুই দেশের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, প্রতি বছর সর্বোচ্চ চার হাজার বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ দুই বছরে প্রায় আট হাজার কর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে বৈধ পথে গ্রিসে গেছেন ৫০০ জনেরও কম। কাগজে-কলমে থাকা সম্ভাবনা আর বাস্তবতার এই ব্যবধানই এখন বড় উদ্বেগের কারণ।
চাহিদা আছে, নেই যাওয়ার সহজ পথ
গ্রিসে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা থাকার বিষয়টি জানিয়েছেন দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা রহমান সুমনা। জাগো নিউজকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কৃষি খামার থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁর মালিক—বিভিন্ন খাতের নিয়োগকর্তারা নিয়মিত বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছেন। বাংলাদেশিরা কাজেও দক্ষ। কিন্তু ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সেই চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না।
সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশে গ্রিসের পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস না থাকা। ফলে গ্রিসের ভিসার জন্য বাংলাদেশিদের আবেদন ও সাক্ষাৎকারের ক্ষেত্রে দিল্লির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সেখানে যেতে হলে প্রয়োজন ভারতীয় ভিসা। সেই ভিসা পেতে দেরি কিংবা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়াই অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়।
একজন কর্মীর জন্য বিষয়টি শুধু বিদেশযাত্রার জটিলতা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে চাকরি, আয় এবং পরিবারের ভবিষ্যতের হিসাব। নিয়োগকর্তারা সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর্মী চান। সেই সময়সীমার মধ্যে বাংলাদেশি কর্মী ভিসা পেয়ে পৌঁছাতে না পারলে তাঁরা অপেক্ষা করেন না। প্রয়োজন মেটাতে অন্য দেশ থেকে লোক নিয়োগ করেন। ফলে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ থাকা সুযোগ চলে যায় অন্য দেশের কর্মীদের হাতে।
সমাধানের চেষ্টা, কিন্তু অগ্রগতি কতটা?
রাষ্ট্রদূত নাহিদা রহমান সুমনা জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রায় প্রতি মাসেই গ্রিসের পররাষ্ট্র ও অভিবাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরেছেন তিনি। বাংলাদেশে নিয়মিত গ্রিক কনস্যুলার টিম পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি অন্য কোনো দেশের গ্রিক দূতাবাসের মাধ্যমে বাংলাদেশিদের ভিসার আবেদন ও সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করার বিষয়টিও আলোচনায় এনেছেন।
তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশ থেকে অনেক কর্মী আইনসম্মতভাবে গ্রিসে যেতে চান। কিন্তু ভারতীয় ভিসার জটিলতায় তাঁরা দিল্লিতে পৌঁছাতে পারছেন না। অথচ গ্রিক নিয়োগকর্তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর্মী প্রয়োজন। সময়মতো কর্মী না পেলে তাঁরা বিকল্প দেশ থেকে নিয়োগ দিতে বাধ্য হন।
এখানেই বাংলাদেশের জন্য সংকটটি আরও গভীর। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে শুধু কর্মী পাঠানোর অনুমতি বা নিয়োগের চাহিদা থাকলেই হয় না; সেই সুযোগ কাজে লাগানোর মতো কার্যকর ব্যবস্থাও থাকতে হয়। নিয়োগকর্তার চাহিদা, কর্মীর প্রস্তুতি এবং ভিসা প্রক্রিয়ার মধ্যে সমন্বয় না থাকলে চুক্তির সুবিধা বাস্তবে রূপ নেয় না।
সম্ভাবনা ধরে রাখতে এখনই উদ্যোগ জরুরি
গ্রিসের শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। কৃষি, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন খাতে কর্মীর চাহিদা থাকলেও সেই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারার অর্থ শুধু কয়েক হাজার চাকরির সম্ভাবনা হারানো নয়; দীর্ঘ মেয়াদে একটি শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হওয়া।
এ অবস্থায় বাংলাদেশে নিয়মিত গ্রিক কনস্যুলার কার্যক্রম চালু, বিকল্প দেশে ভিসার আবেদন ও সাক্ষাৎকারের সুযোগ তৈরি এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া সহজ করতে সরকারি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুই দেশের বিদ্যমান সমঝোতার সুযোগ বাস্তবে কতটা কাজে লাগানো যাচ্ছে, সেটিও নিয়মিত পর্যালোচনা করা জরুরি।
কারণ, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে সুযোগ সব সময় অপেক্ষা করে না। একজন নিয়োগকর্তা যখন সময়মতো কর্মী পান না, তখন তিনি অন্য দেশের দিকে হাত বাড়ান। সেই শূন্যস্থান একবার অন্য দেশের কর্মীরা পূরণ করে ফেললে তা আবার ফিরে পাওয়া সহজ নয়। ইমন মিয়ার মতো কর্মীদের ব্যক্তিগত স্বপ্নের সঙ্গে তাই জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারে টিকে থাকার প্রশ্ন। সময়মতো ভিসার পথ সহজ করা না গেলে গ্রিসের দরজা খোলা থাকলেও সেখানে পৌঁছানোর সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হতে পারে।
সূত্র: জাগো নিউজ