বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রণালি খুলে দেওয়া কেবল একটি শুরু মাত্র। ইরান থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত পর্যন্ত অন্তত ৯টি দেশের কয়েক ডজন শোধনাগার, মজুত কেন্দ্র এবং তেল ও গ্যাসক্ষেত্র হামলার শিকার হয়েছে। সব মিলিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের ১০ শতাংশ বা তারও বেশি বর্তমানে বন্ধ হয়ে আছে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পুনরায় চালু করা কেবল যাতায়াত পথ নিরাপদ করার ওপর নির্ভর করছে না। এর জন্য প্রয়োজন পাম্পগুলো পুনরায় পরীক্ষা করা, ক্ষতিগ্রস্ত বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া কর্মীদের কাজে ফিরিয়ে আনা।
জ্বালানি খাতের অভিজ্ঞ নির্বাহী ও বেশ কয়েকটি কোম্পানির বোর্ড সদস্য মার্টিন হিউস্টন বলেন, এটি এমন কোনও বিষয় নয় যে আপনি কেবল একটি সুইচ টিপলেন আর সবকিছু আবার আগের মতো চালু হয়ে গেলো।
উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ব্যবস্থা স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার সময়সীমা নিয়ে প্রবল অনিশ্চয়তা রয়েছে। প্রথমত, যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছে মাত্র দুই সপ্তাহের জন্য।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন এই চুক্তির ঘোষণা দেন, তখন ইরান জাহাজ চলাচলে হামলা না করার প্রতিশ্রুতি দেয়। এর আগে ওই দিনই ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন যে, জলপথ বন্ধ থাকলে ‘আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা হারিয়ে যাবে, যা আর কখনোই ফিরে আসবে না।’ তিনি বারবার ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়েছেন, যা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
যুদ্ধবিরতির আগ মুহূর্ত পর্যন্ত কুয়েতের তেল শোধনাগার ও ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে হামলা অব্যাহত ছিল। দেশগুলো তথ্য প্রকাশ না করায় অবকাঠামোর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও অজানা।
শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, জলপথ নিরাপদ হলে মজুত থাকা তেল দ্রুত বাজারে পাঠানো সম্ভব হবে এবং কিছু কূপ কয়েক দিন বা সপ্তাহের মধ্যে চালু হতে পারে। তবে পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধারে কয়েক মাস এবং মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও সাধারণ গ্রাহকদের জন্য পেট্রোলের দাম খুব দ্রুত কমার সম্ভাবনা কম। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম ৪ ডলার ছাড়িয়েছে। যুদ্ধের আগে যে দাম ছিল, সেখানে ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগবে।
কারিগরি দিক থেকে তেলকূপ দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কূপ বন্ধ থাকলে ভূগর্ভস্থ চাপ ওলটপালট হয়ে যায় এবং ভেতরে পানি জমে যেতে পারে। এছাড়া দীর্ঘ সময় হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের সংস্পর্শে থাকলে যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরে যায়। সৌদি আরব ও ইরাকের মতো দেশগুলো তাদের কূপে গ্যাস বা পানি ঢুকিয়ে তেলের প্রবাহ ঠিক রাখে, যা পুনরায় চালু করা বেশ জটিল প্রক্রিয়া।
কুয়েত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী শেখ নওয়াফ আল সাবাহ জানান, পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে কয়েক দিনের মধ্যে উৎপাদন শুরু হলেও পূর্ণ ক্ষমতায় ফিরতে তিন থেকে চার মাস সময় লাগবে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্র হলো কাতারের রাস লাফান প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানি কেন্দ্র। এটি এশিয়া ও ইউরোপে রান্নার গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি সরবরাহ করে। যুদ্ধের শুরুতে কাতার এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) উৎপাদন বন্ধ করে দেয় এবং পরে মিসাইল হামলায় এর উৎপাদন ক্ষমতার ১৭ শতাংশ ধ্বংস হয়ে যায়।
রাস লাফানের সাবেক বিশেষজ্ঞ মেহেদী তৌইল জানান, অক্ষত অংশগুলো চালু করতে কয়েক সপ্তাহ বা মাস লাগলেও ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো ঠিক করা হবে দুঃসাধ্য। কাতারএনার্জির মতে, ক্ষতিগ্রস্ত দুটি এলএনজি ইউনিট মেরামতে কয়েক বছর সময় লাগবে। একেকটি ইউনিটের মূল অংশ ১৮ তলা ভবনের সমান উঁচু হতে পারে এবং নতুন যন্ত্রাংশ তৈরিতেই সময় লাগে দুই বছরের বেশি।
ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার প্রকৌশলবিদ্যার অধ্যাপক নাজমেদিন মেশকাতি বলেন, এই স্থাপনাগুলো বিশেষভাবে ডিজাইন করা এবং মূল কমপ্লেক্সের সঙ্গে সমন্বিত, যা সাধারণ অবকাঠামোর তুলনায় প্রতিস্থাপন করা অনেক বেশি কঠিন।
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) জন্য ডেটা সেন্টার তৈরির হিড়িক চলায় বিশ্বজুড়ে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র ও টারবাইনের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রগুলো মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত যন্ত্রাংশ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
ওকলাহোমা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মাইক স্টাইস বলেন, ‘আপনার কাছে সঠিক সরবরাহ ব্যবস্থা থাকলে দ্রুত মেরামত সম্ভব। কিন্তু এমন কোনও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় যার সরবরাহ পেতে দুই বছর সময় লাগে, তবে পুরো প্রক্রিয়া থমকে যাবে।’
বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন যে যুদ্ধের আগের তুলনায় জ্বালানি তেলের দাম ভবিষ্যতে কিছুটা বেশিই থাকবে। ফরাসি ব্যাংক সোসিয়েট জেনারেলের মতে, ২০২৬ সালের শেষে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৮০ ডলারের আশেপাশে থাকতে পারে, যা তাদের আগের পূর্বাভাসের (৬৫ ডলার) চেয়ে অনেক বেশি। ব্যবসায়ীরা এখন ভবিষ্যতের যেকোনও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেই বিনিয়োগ করবেন।