জানা যায়, ২০১৬ সালে ভয়াবহ নদীভাঙনের ফলে ইসলামাবাদ গ্রামের এই অংশটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর থেকে গ্রামটির চারপাশে বিষখালী নদীর পানি বেষ্টিত অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে নৌকা ও ট্রলারই এখানকার মানুষের একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। জরুরি প্রয়োজনে উপজেলা সদর কিংবা জেলা শহরে যেতে হলে তাদের নদীপথেই নির্ভর করতে হয়।
স্থানীয়রা জানান, একসময় এই এলাকায় শত শত একর আবাদি জমি ছিল। নদীভাঙনে ধীরে ধীরে সেই জমি হারিয়ে গেছে। অনেক পরিবার একাধিকবার ভাঙনের শিকার হয়ে বসতভিটা হারিয়েছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অন্যত্র চলে গেলেও যারা এখনও টিকে আছেন, তারা প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তা নিয়ে বসবাস করছেন।
বর্তমানে দ্বীপটিতে প্রায় ৫৪টি পরিবার বসবাস করছে। জনসংখ্যা আনুমানিক ৫২০ জন। উত্তর-দক্ষিণে প্রায় দুই কিলোমিটারের বেশি এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় এক কিলোমিটার বিস্তৃত এই দ্বীপের আয়তনও বছর বছর কমে আসছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে অদূর ভবিষ্যতে পুরো জনপদটিই নদীগর্ভে হারিয়ে যেতে পারে।
চর ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. কাইউম বাদশাহ বলেন, একসময় আমাদের বিদ্যালয়ে শতাধিক শিক্ষার্থী ছিল। এখন শিক্ষার্থী সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৪০ জনে। শিক্ষকও ছিল পর্যাপ্ত। বর্তমানে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র দুইজন। এলাকার মানুষ একের পর এক ভাঙনের শিকার হওয়ায় অনেকে অন্যত্র চলে গেছেন। ফলে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে গেছে।
দ্বীপের উত্তর অংশে নদীভাঙনের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। নদীভাঙনের অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি অবৈধ বালু উত্তোলনকে দায়ী করেন। তার অভিযোগ, নদীতে ১৫ থেকে ২০টি ড্রেজারের মাধ্যমে নিয়মিত বালু উত্তোলন করা হয়, যার প্রভাব তীরবর্তী এলাকায় পড়ছে।
শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবাও এখানকার মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বীপে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। অসুস্থ রোগীকে নৌকায় করে মূল ভূখণ্ডে নিতে হয়। বর্ষাকালে কিংবা বৈরী আবহাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হলে অনেক সময় রোগীকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুস ছালাম বলেন, আমরা সবসময় ভাঙনের ভয় নিয়ে থাকি। কখন ঘরবাড়ি নদীতে চলে যায়, সেই আতঙ্কে রাত কাটে। নদীভাঙনের কারণে বহু মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। যারা আছি, তারাও জানি না কতদিন টিকে থাকতে পারব।
রানাপাশা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য ও বর্তমানে দ্বীপের বাসিন্দা খলিলুর রহমান বলেন, নদীভাঙনে এই এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এক সময় যাদের অনেক জমিজমা ছিল, এখন তাদের অনেকেই ভূমিহীন হয়ে পড়েছেন। আমরা বারবার ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানালেও কার্যকর উদ্যোগ দেখতে পাইনি।
বিদ্যালয়ের অভিভাবক বেলায়েত হোসেন বলেন, আমাদের সন্তানদের লেখাপড়ার পরিবেশ আগের মতো নেই। যোগাযোগ সমস্যা, শিক্ষক সংকট এবং মানুষের স্থানান্তরের কারণে শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভাঙন বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে বিদ্যালয়টিও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বাসিন্দা আবুল কালাম মোল্লা বলেন, এখানে বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগসহ সব ক্ষেত্রেই সমস্যা। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস বা দুর্যোগের সময় আমাদের কষ্ট আরও বেড়ে যায়। আমরা শুধু চাই ভাঙন বন্ধের ব্যবস্থা হোক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর তলদেশ থেকে অপরিকল্পিত ও অবৈধ বালু উত্তোলন ভাঙনের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি পরিবর্তিত হওয়ায় তীরবর্তী এলাকায় স্রোতের চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে প্রতিবছর নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
সরকারি নলছিটি ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত সহযোগী অধ্যাপক সামছুল আলম খান বাহার বলেন, বিষখালী নদীর ভাঙনে ইসলামাবাদ গ্রামের মানুষ বছরের পর বছর ধরে কষ্ট করে আসছে। একসময় এখানে অনেক মানুষ ও বসতবাড়ি ছিল, এখন তার বেশিরভাগই নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। যারা এখনও এখানে বসবাস করছেন, তারা সবসময় ভাঙনের আতঙ্কে থাকেন। দ্রুত ভাঙন রোধে ব্যবস্থা না নিলে একদিন পুরো এলাকাটিই নদীগর্ভে চলে যাবে। তাই মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের নদীভাঙন কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, অনেক ক্ষেত্রে মানবসৃষ্ট কারণও এর জন্য দায়ী। নদীর নাব্যতা পরিবর্তন, অবৈধ বালু উত্তোলন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব ভাঙনের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। ফলে নদীতীরবর্তী জনপদগুলো ক্রমেই বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রিজভী আহমেদ সবুজ বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। নদীভাঙন রোধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম নিলয় পাশা এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
স্থানীয়দের মতে, আশ্বাস নয়, এখন প্রয়োজন দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপ। কারণ প্রতিটি বর্ষা মৌসুম তাদের জন্য নতুন আতঙ্ক নিয়ে আসে। নদীর ভাঙন যেমন তাদের জমি ও ঘরবাড়ি কেড়ে নিচ্ছে, তেমনি কেড়ে নিচ্ছে ভবিষ্যতের স্বপ্নও।
নদীভাঙনে সৃষ্টি হওয়া ইসলামাবাদের এই দ্বীপটি আজ এক কঠিন বাস্তবতার প্রতীক। দেশের মূলধারার উন্নয়ন যখন এগিয়ে চলেছে, তখন নদীর মাঝখানে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা শত শত মানুষ এখনও মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ভাঙনের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং টেকসই নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই জনপদকে রক্ষা করা না গেলে খুব শিগগিরই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে চর ইসলামাবাদের শেষ অবশিষ্ট অংশটুকুও। তখন শুধু একটি গ্রামের বিলীন হওয়াই নয়, হারিয়ে যাবে বহু মানুষের জীবনসংগ্রাম, স্মৃতি ও শেকড়ের চিহ্ন।