জানা যায়, দীর্ঘদিন যাবত ফেনী এবং আশপাশের উপজেলা গুলোতে বাল্য বিয়ের পরিমান ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। যার কারণে পারিবারিক নানা সমস্যার সৃস্টি হচ্ছে। এ নিয়ে ফেনীর সচেতন মহলের মাঝে নানা ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করলেও কোনভাবেই বাল্য বিয়ে থামানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে ফেনী পৌরসভার ১৬ নং ওয়ার্ডের কাজীর দায়িত্বে থাকা মো. শাজাহানকে টাকা দিলেই মেলে বিবাহের নিবন্ধন। গোপনে ও প্রকাশ্যে দীর্ঘদিন এ ধরনের আইন বহির্ভূত কার্যক্রম ফেনীতে চলমান রয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, প্রবাসী অধ্যুষিত ফেনীতে প্রেম করে পালিয়ে কিশোরদের বিয়ের প্রবণতা বেড়েছে। চলতি বছরে অনন্ত ১০ থেকে ১৫ যুগল প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার আগেই পালিয়ে বিয়ে করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভে এসে বিয়ের ঘোষণা দেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ এক কিশোরী জানান, তিনি একটি স্কুলের নবম শ্রেনিতে পড়েন। প্রথমে ওই এলাকার এক তরুণের সাথে তার প্রেম হয়। বিষয়টি টের পেয়ে তার মা তাকে নানাভাবে বাধা দেয়। এক পর্যায়ে ওই তরুণী মা-বাবাকে না জানিয়ে ফেনীর এক আইনজীবীর চেম্বারে গিয়ে বয়সের এফিডেভিড করেন। পরে ওই আইনজীবী এক জন কাজীকে মোবাইলে ডেকে আমাদের বিয়ে পড়ান। এর ৩ দিন পর আমার পরিবার থানায় অভিযোগ করেন। পরে আমি আমার স্বামীসহ ফেসবুক লাইভে এসে বিয়ের ঘোষণা করি।
ওই কিশোরী জানান, বয়সের এফিডেভিট করে ফেনীতে সবাই বিয়ে করছে।
এদিকে ফেনীতে বাল্য বিয়ের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় সচেতন মহলে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এ ধরনের একটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২ আগস্ট ফেনী জেলা রেজিস্ট্রার আবদুর রহমান মুহাম্মদ তামিম ফেনী পৌরসভার ১৬ নং ওয়ার্ডের নিকাহ্ ও তালাক নিবন্ধক কাজী শাহজাহানকে শোকজ করেন।
ওই শোকজপত্রে জেলা রেজিস্ট্রার উল্লেখ করেন, শাহ জাহানের বিরুদ্ধে বাল্য বিবাহ রেজিস্ট্রিসহ নিকাহ সংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়ে নিম্নস্বাক্ষরকারীর বরাবর বিভিন্ন সুত্রে অভিযোগ পাওয়া যায়। তদ্ প্রেক্ষিতে আপনার নিকট হতে অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য আপনার কর্তৃক সম্পাদিত ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের ৫২নং নিকাহ রেজিস্ট্রি সংক্রান্ত বালাম বহিটি তলব করা হলে আপনি স্বশরীরে বালাম বহি নিয়ে নিম্নস্বাক্ষরকারী কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট বালাম বহিটি উপস্থাপন করেন। সংশ্লিষ্ট বালাম বহিটি যার তালিকা নম্বর-৯৬, পর্যালোচনা করে অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়। এছাড়া উক্ত বালামটি যাচাই-বাছাইকালে পুরো বালাম বহিতে নিকাহ রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরবিহীন থাকা, নিকাহ রেজিস্ট্রির তারিখ ক্রমানুসারে ধারাবাহিক না রেখে সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে ইচ্ছামতো ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে পরে ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে নিকাহ রেজিস্ট্রি সম্পাদনের গুরুতর ত্রুটি এবং সংশ্লিষ্ট বালামের কিছু কিছু পৃষ্ঠায় শুধুমাত্র বর-কনের স্বাক্ষর নিয়ে অন্যান্য কলামগুলো সম্পূর্ণ খালি রাখা এবং একটি সরকারী বালাম বহিতে বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক ব্যক্তির নাম, সংকেত ও মোবাইল ফোন লিখে রাখাসহ নানা অনিয়ম ও ত্রুটিসমূহ পরিলক্ষিত হয়। যাতে উক্তরুপ গুরুতর অনিয়ম ও অপরাধের সাথে আপনার সরাসরি সংশ্লিষ্ঠতা রয়েছে মর্মে প্রাথমিকভাবে সত্যতা পাওয়া যায়। বর্ণিত অবস্থাধীনে আপনার অন্যান্য বালাম সমূহেও একই ধরণের অনিয়ম ও অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কিনা তা যাচাই-বাছাই করা আবশ্যকতা রয়েছে। ২০২০ হতে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে আপনার কর্তৃক রেজিস্ট্রিকৃত সমস্ত বালাম ও তালিকাবহিসহ এ পত্র প্রাপ্তির ৩ কর্ম দিবসের মাঝে নিম্নস্বাক্ষরকারীর কার্যালয়ে উপস্থাপন করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দর্শানোর জবাব দাখিলে ব্যর্থ হলে অভিযোগের সত্যতা রয়েছে মর্মে গণ্য করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ১৬ নং ওয়ার্ডের কাজী মো. শাহ জাহান বলেন, শোকজের কপি হাতে পেয়েছি। জন্ম নিবন্ধনের আলোকে বিয়ে নিবন্ধন করা হয়েছে। ওই জন্ম নিবন্ধনের অনলাইন চেক করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সে বিষয়টি চেক করার প্রযুক্তি আমাদের হাতে নেই।
ফেনী জেলা রেজিস্ট্রার আবদুর রহমান মুহাম্মদ তামিম বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতে ফেনী পৌরসভার ১৬ নং ওয়ার্ডের নিকাহ্ ও তালাক নিবন্ধক কাজী মো. শাহ জাহানকে শোকজ করা হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করব। নিকাহ্ রেজিস্ট্রার এর ক্ষেত্রে আইনবহির্ভূত কোন কিছুই মেনে নেওয়া হবে না।