শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬ ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Channel18

অন্যান্য

আলোক নিবাস: বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত ক্যান্সার রোগীদের জন্য আশ্রয়স্থল

আলোক নিবাস: বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত ক্যান্সার রোগীদের জন্য আশ্রয়স্থল

গার্মেন্টস ব্যবসায়ী হিসেবে নাজমুস আহমেদ আলবাব যখন সাফল্যের শিখরে, ঠিক তখনই তার শরীরে ধরা পড়ে ব্লাড ক্যানসার। অন্য কোনো ক্যানসার হলে বাঁচার আশা হয়তো কিছুটা হলেও থাকত, কিন্তু চিকিৎসকদের মতে ব্লাড ক্যানসারে সে আশাও ক্ষীণ। মৃত্যুই যেন একমাত্র গন্তব্য। আলবাব তাই ভেতরে ভেতরে নিজেকে সেভাবেই প্রস্তুত করছিলেন।

 

কিন্তু মৃত্যুর কথা ভাবলেই চোখের সামনে ভেসে উঠত বাবার মুখ, সন্তানদের মুখ, পরিবারের সবার মুখ। তিনি মারা গেলে তাদের কী হবে? তাই তিনি বাঁচতে চাইতেন, খুব প্রবলভাবেই বাঁচতে চাইতেন। তবে নিজের জন্য যতটা, তার চেয়েও অনেক বেশি পরিবারের জন্য।

সময় কাটত হাসপাতালের বারান্দায় বারান্দায় হেঁটে 

সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা এবং পরিবারের চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফেরেন আলবাব। ২০০৯ সালে তার ক্যানসার ধরা পড়ার পর দুই বছর দেশের বাইরে সিঙ্গাপুরে চলে চিকিৎসা। এরপর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ২০১১ সালে দেশে ফিরে আসেন তিনি।

 

ফিরে এলেও আগের জীবনযাপনে আর মন বসাতে পারছিলেন না আলবাব। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার সেই দিনগুলোর স্মৃতি বারবার তার মনে পড়ত। আর তাড়া করে বেড়াত একটাই প্রশ্ন—যাদের তার মতো সিঙ্গাপুরে গিয়ে উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য নেই, তারা কীভাবে বাঁচেন? সমাজের যে মানুষগুলো অসহায় ও গরিব, তারা কীভাবে এই ক্যানসার নামক যুদ্ধ পাড়ি দেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন। যাতায়াত শুরু করলেন বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে, যেখানে মূলত দেশের আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষেরা চিকিৎসার জন্য আসেন। হাতে তখন তার অঢেল সময়। তাই সারা দিন সরকারি হাসপাতালগুলোর বারান্দায় বারান্দায় হেঁটে বেড়াতেন। দেখতেন, সামর্থ্য না থাকায় কীভাবে হাসপাতালের বারান্দা আর করিডোরের নোংরা, ঘিঞ্জি পরিবেশে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে একেকজন ক্যানসার রোগীকে।

আলবাব ছোটবেলা থেকেই ছিলেন কিছুটা আবেগপ্রবণ ও নরম মনের মানুষ। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আগে আমিও কিছুটা উন্নত জীবনযাপনের লোভ করতাম। ভাবতাম, ব্যবসায় কীভাবে দুইয়ে দুইয়ে চার মেলানো যায়। সবসময় মাথায় ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতির চিন্তা ঘুরত। কিন্তু ক্যানসার আমাকে দেখিয়েছে জীবন আসলে কী। জীবনে দুইয়ে দুইয়ে চার হওয়ার কোনো দরকার নেই, এক হলেও জীবন সুন্দরভাবে চালানো যায়। এই ক্যানসারই আসলে আমার "নিজেকে" চিনতে শিখিয়েছে।’

নিজের জন্য নয়, মানুষের জন্য বাঁচা

হাসপাতালের করিডোরে মশা-মাছির উপদ্রবের মধ্যে যখন ওই অসহায় মানুষগুলোকে শুয়ে থাকতে দেখতেন, তখন নিজের ফেলে আসা অসুস্থতার দিনগুলোর কথা মনে পড়ত তার। প্রথম দিকে এই দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়তেন তিনি। কেবলই ভাবতেন, এত মানুষের ভিড়ে কেন আল্লাহ তাকেই জীবন ফিরিয়ে দিলেন? কেন তাকেই এত উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন?

সেই আত্মোপলব্ধি আর সৃষ্টিকর্তার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই শুরু হয় তার নতুন এক জীবন। নিজের জন্য নয়, বরং মানুষের জন্য বাঁচা। এমনকি দীর্ঘ এক যুগের অভিজ্ঞতাকে অগ্রাহ্য করে ২০১৩ সালে তিনি গার্মেন্টস ব্যবসাও ছেড়ে দেন। এরপর শুরু করলেন তহবিল সংগ্রহের কাজ। নিজের বাসা থেকেই পরিচিতজনদের সাহায্যে শুরু করলেন অনুদান সংগ্রহের উদ্যোগ, যেন এই অর্থে অসচ্ছল রোগীরা তাদের চিকিৎসাটুকু করাতে পারেন।

ক্যানসারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন—এমন বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতজনদের সঙ্গে নিয়ে ২০১৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'বাংলাদেশ ক্যানসার এইড ফাউন্ডেশন'। ধীরে ধীরে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে প্রতি মাসে প্রায় ১০-১২ লাখ টাকার অনুদান আসতে শুরু করল। সবাই যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী হাত বাড়িয়ে দিতে লাগলেন।

তখন বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে আসা অসহায় রোগীদের হাতে চিকিৎসার খরচ বাবদ এ অর্থ তুলে দেওয়া হতো। প্রথম মাসে মাত্র একজন রোগীকে দিয়ে শুরু হলেও আস্তে আস্তে রোগীর সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ১০, ২০, ৩০ ছাড়িয়ে গেল। একপর্যায়ে হাসপাতালের চিকিৎসকরাও আলবাবকে চিনে ফেললেন।

শান্তি পাচ্ছিল না মন

এভাবে বেশ কয়েক বছর চলল। কিন্তু আলবাবের মন তাতে শান্তি পাচ্ছিল না। তিনি উপলব্ধি করলেন, টাকা দিয়েই তো সব সমস্যার সমাধান হয় না। চিকিৎসার খরচ কিছুটা কমলেও সেই অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে কোনোভাবে মাথা গুঁজে রোগীদের দিনাতিপাত চলতেই থাকে। এমনকি সেই সামান্য জায়গাটুকুর জন্যও তাদের কত যুদ্ধ করতে হচ্ছে!

তাছাড়া অনেকে টাকা নিয়ে গ্রামে চলে যেতেন, ফলে আদৌ ঠিকমতো তাদের চিকিৎসা হচ্ছে কি না, তার নিশ্চয়তা পাওয়া যেত না।

আলবাব এবার সম্পূর্ণ নতুন কিছু করার সিদ্ধান্ত নিলেন। বুঝলেন, শুধু টাকা নয়; এসব মানুষের কষ্ট লাঘব করতে সবার আগে প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর থাকা-খাওয়ার পরিবেশ। যাতে করে ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীদের আর হাসপাতালের মেঝে বা বারান্দায় পড়ে থেকে দিনের পর দিন চিকিৎসা নিতে না হয়। আর এ জন্য দরকার একটি আশ্রয়ের ব্যবস্থা, যেখানে হাসপাতালের কাজ শেষে রোগীরা এসে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিতে পারবেন, প্রয়োজনমতো থাকতে পারবেন।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালে 'বাংলাদেশ ক্যানসার এইড ফাউন্ডেশন' রূপ নেয় 'বাংলাদেশ ক্যানসার এইড ট্রাস্ট' (ব্যানক্যাট)-এ। গুলশানের একটি ভাড়া বাড়িতে খোলা হলো এর স্থায়ী কার্যালয়। ফলে আগে যারা কাজের ফাঁকে যতটুকু পারতেন সময় দিতেন, তারা এবার পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে ব্যানক্যাটের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করলেন।

আলবাব বলেন, ‘আমি এ যাত্রায় মূলত তাদেরই সঙ্গে নিয়েছি, যাদের পরিবারের কেউ না কেউ বা কোনো না কোনোভাবে ক্যানসারে অ্যাফেক্টেড। ফলে আমাদের সবার চিন্তাভাবনা ছিল সমমনা। একদিন কফি খেতে গিয়ে দেখা হয়ে যায় রোকাইয়া আফজাল রহমানের সঙ্গে। তার সঙ্গে আমার পূর্বপরিচয় ছিল। তাকে আমার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বললাম, "আপনাকে বাড়তি কিছু করতে হবে না, শুধু মাথার মুকুট হয়ে থাকবেন।" তিনি হয়তো আমার ওপর আস্থা পেয়েছিলেন, তাই একটি কথাতেই সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি আমাদের মাথার ওপর ছিলেন। শুধু তিনি নন, এ পর্যন্ত যারা আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, সবার মনমানসিকতাই এক।’

ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই মানে কেবল শরীরের সাথে ওষুধের যুদ্ধ নয়; এটি এক কঠিন মানসিক ও সামাজিক সংগ্রামও। সেই কঠিন সময়ে সুবিধাবঞ্চিত ক্যানসার যোদ্ধা ও তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে বাংলাদেশ ক্যানসার এইড ট্রাস্টের এক অনন্য মানবিক উদ্যোগ—'মোসাব্বির আলোক নিবাস'।

'মোসাব্বির' নামের পেছনের গল্প

২০১৯ সালে সেই ভাবনা থেকেই বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি একতলা ভাড়া বাড়িতে শুরু হয় 'মোসাব্বির আলোক নিবাস'। তবে এই 'মোসাব্বির' নামকরণের পেছনে রয়েছে এক গল্প।

আলোক নিবাস শুরুর একেবারে প্রথম দিকের ঘটনা। তখন আরজে কিবরিয়ার একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন নাজমুস আহমেদ আলবাব। সেই অনুষ্ঠানটির জন্য আলবাব একদমই প্রস্তুত ছিলেন না। ভিডিওটি ইউটিউবে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং বহু মানুষ তা শেয়ার করেন।

আলবাব বলেন, ‘ওই ভিডিওটি দেখেই এক ভদ্রলোক প্রায় ছয় মাস ধরে আমার কাজের ওপর নজর রাখছিলেন। অবশেষে একদিন তিনি আমাকে ফোন করে বললেন, "আমি আমার প্রতিষ্ঠানটি তোমাকে দিয়ে দিতে চাই। আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যে টাকা আছে, সেটাও তোমার দায়িত্বে রেখে যেতে চাই।"’

সেই মহান ব্যক্তিটি ছিলেন বীর প্রতীক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোদাচ্ছির হোসেন খান। তার ছেলে মাত্র ১৪ বছর বয়সে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ফলে ক্যানসার রোগীদের জন্য কিছু একটা করার ইচ্ছা তার ভেতরেও কাজ করছিল। আলবাবের স্বপ্নের সঙ্গে নিজের ইচ্ছার মিল খুঁজে পেয়ে তিনি তার পুরো প্রতিষ্ঠান ব্যানক্যাটকে দান করে দেন। পরবর্তীতে তার প্রয়াত ছেলে মোসাব্বিরের নামানুসারেই এই আশ্রয়স্থলের নাম রাখা হয় 'মোসাব্বির আলোক নিবাস'। বর্তমানে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এ-ব্লকের ৩ নম্বর রোডে এটি পরিচালিত হচ্ছে।

প্রতিদিন রান্না হয় ছয়শো মানুষের খাবার

আলোক নিবাসের জন্য তহবিল গঠন শুরু হয় ২০২০ সালে এবং সরাসরি সেবা কার্যক্রম চালু হয় ২০২১ সাল থেকে। শুরুতে ২৪টি শয্যার বিপরীতে কর্মী ছিলেন ১২ জন। এর মধ্যেই ছিলেন নার্স, ওয়ার্ড বয়, কিচেন বয়, চালক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী। সে সময় একটিমাত্র অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল।

পরবর্তীতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাতেই কিছুটা দূরে আরেকটি পূর্ণাঙ্গ ভবন ভাড়া নেওয়া হয় 'আলোক নিবাস-২'-এর জন্য। বর্তমানে আলোক নিবাস-১ এবং আলোক নিবাস-২; এই দুটি ভবন মিলিয়ে মোট শয্যাসংখ্যা ৮৫টি। ৮৫ জন রোগীর সঙ্গে তাদের স্বজন বা অ্যাটেনডেন্ট মিলিয়ে থাকেন আরও ৮৫ জন। আর তাদের সেবায় নিয়োজিত আছেন মোট ৪৭ জন কর্মী। এর মধ্যে রান্নাঘরে ৬ জন, নার্স ও কেয়ারগিভার ৯ জন, অ্যাম্বুলেন্স ও গাড়িচালক ৪ জন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ৪ জন, ওয়ার্ড বয় ৪ জন এবং একজন সুপারভাইজার রয়েছেন। রোগীরা যেন দিন-রাত যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে সার্বক্ষণিক সেবা পান, সেজন্য কর্মীরা দৈনিক ৮ ঘণ্টা করে পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করেন।

সব মিলিয়ে এখানে দিনে তিন বেলা ২০০ জন করে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ মানুষের খাবার রান্না হয়। ক্যানসারের ধরন ও রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে একেকজনের জন্য একেক ধরনের পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা থাকে। আবার কেউ চাইলে নিজেরাও রান্না করে খেতে পারেন।

এ ছাড়া বাইরে থেকে সপ্তাহে দুই দিন একজন সাইকোলজিস্ট (মনোবিদ) এবং একজন নিউট্রিশনিস্ট (পুষ্টিবিদ) আসেন। পুষ্টিবিদ এসে প্রেসক্রিপশন দেখে রোগীদের উপযোগী আলাদা খাবারের তালিকা তৈরি করে দেন। আর মনোবিদ এসে রোগী ও তাদের স্বজনদের মানসিক অবসাদ দূর করতে বিশেষ কাউন্সেলিং সেশন পরিচালনা করেন।

আলোক নিবাস-২-এর প্রতিটি তলা রোগীদের ধরন অনুযায়ী বিন্যস্ত। যেমন একটি তলা শিশুদের জন্য, একটি নারীদের জন্য এবং অন্য একটি তলা পুরুষদের জন্য বরাদ্দ। এ ছাড়া প্রার্থনা ও নামাজের জন্য রয়েছে আলাদা একটি ফ্লোর এবং খাওয়ার জন্য রয়েছে পৃথক ডাইনিং ফ্লোর।

‘পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে কোনো আপস নেই’

সাধারণত সকাল ছয়টা থেকে দুপুর তিনটা পর্যন্ত আলোক নিবাসের রোগীরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকেন। ব্যানক্যাটের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক সৈয়দ নাসিরউদ্দীন তারেক বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে রোগীরা ফেরার পর প্রথমেই আমরা তাদের সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত করি। এরপর গোসলে পাঠানো হয় এবং গোসলের পরেই কেবল খাবার দেওয়া হয়। গোসল শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে খাবার দেওয়ার নিয়ম নেই। স্বাস্থ্যবিধি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে আমাদের নিয়ম অত্যন্ত কড়া। এমনকি রোগীর সঙ্গে আসা স্বজনদের দিয়েও আমরা ছোটখাটো পরিচ্ছন্নতার কাজ করাই, যেন তাদের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি হয়। আর এ কারণেই পুরো পরিবেশ এতটা পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব হয়।’

আলোক নিবাসের একজন রোগী পারভীন আক্তার। তিন বছর আগে যখন তার রোগ ধরা পড়ে, তখন তিনি ওভারিয়ান ক্যানসারের চতুর্থ পর্যায়ে (ফোর্থ স্টেজ) ছিলেন। প্রায় এক বছর ধরে তিনি আলোক নিবাসে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কেমোথেরাপি নিতে আসার সময় তার সঙ্গে আসেন মেয়ে সায়রা বানু (ছদ্মনাম)। তিনি একটি কলেজে অনার্সে পড়ছেন।

সায়রা বলেন, ‘আমার মা গ্রামের চেয়ে এখানে থাকলেই বেশি হাসিখুশি থাকেন। আগের চেয়ে এখন অনেকটাই সুস্থ তিনি। আমিও এখানে থাকতে পেরে সত্যিই খুব নিশ্চিন্ত ও আনন্দিত। এত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং এখানকার মানুষগুলো এত আন্তরিক যে একদম নিজের বাড়ির মতো লাগে। ঢাকায় কোনো আত্মীয়ের বাসায় উঠলেও হয়তো এত স্বস্তিতে থাকতে পারতাম না। সবচেয়ে বড় কথা, চিকিৎসা শেষ না হওয়া পর্যন্ত যতদিন প্রয়োজন এখানে থাকা যায়। এমনকি আমার যেন পড়াশোনার ক্ষতি না হয়, সেজন্য এখানকার স্যারদের বলায় তারা আমাকে পড়াশোনার জন্য আলাদা একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।’

চিকিৎসকরাই দেন আলোক নিবাসের সন্ধান

বেশির ভাগ রোগীই চিকিৎসকদের মাধ্যমে আলোক নিবাসের সন্ধান পান। আবার অনেকে হাসপাতালে চিকিৎসার সময় অন্য রোগীদের কাছ থেকে খোঁজ পেয়ে আসেন। কুড়িগ্রামের মেয়ে মোসলেমা আক্তারের এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ায় দুই বছর ধরে তার পড়াশোনা বন্ধ। এখন মাসে একবার তাকে ঢাকায় এসে কেমোথেরাপি নিতে হয়। তখন মায়ের সঙ্গে এসে সে আলোক নিবাসে আশ্রয় নেয়। মোসলেমা জানান, তিনি নিজেই গুগলে সার্চ করে এই আশ্রয়ের খবর পেয়েছিলেন।

 

তবে শুরুর দিনগুলো এত সহজ ছিল না। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান রোগী সমন্বয়কারী রেবেকা আক্তার তখন নিজেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) ও মহাখালীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের মতো জায়গায় ঘুরে ঘুরে চিকিৎসক ও রোগীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতেন। তবে এখন চিকিৎসকরাই রোগীদের আলোক নিবাসের ঠিকানা দিয়ে দেন।

‘কখনো কখনো ধারণক্ষমতার বাইরেও রোগী আসে’

যদিও শয্যাসংখ্যা ৮৫টি, তবে অনেক সময় রোগীর চাপ এর চেয়েও বেশি হয়ে যায়। সৈয়দ নাসিরউদ্দীন তারেক বলেন, ‘আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করি কাউকে ফিরিয়ে না দিতে। ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেলেও কোনো না কোনোভাবে সামলে নেওয়া যায়। কারণ প্রতিনিয়ত যেমন নতুন রোগী আসছেন, তেমনই চিকিৎসা শেষে অনেকে আবার চলেও যাচ্ছেন।’

তবে একসঙ্গে এত মানুষের দেখাশোনা করতে গিয়ে কখনো কখনো পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। তারেক আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিনের রোগভোগের কারণে অনেকের মেজাজ খিটখিটে থাকে, কখনো নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি বা মনোমালিন্য হয়। তখন আমরা তাঁদের বুঝিয়ে শান্ত করি। বলি যে একে অপরকে সাহায্য করলে নিজেদেরও ভালো লাগবে। আসলে তাদের কঠিন মানসিক ও সামাজিক অবস্থা আমাদের বুঝতে হবে। তবে নানা অমিলের মাঝেও তাদের মধ্যে এক অদৃশ্য গভীর বন্ধন কাজ করে; কারণ দিনশেষে তারা সবাই একই পথের সংগ্রামী যোদ্ধা।’

আবাসিক এই জীবনের বাইরে আনন্দ ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখানে এসে শিশুদের জন্য চিত্রাঙ্কনসহ নানা বিনোদনমূলক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। এ ছাড়া ঈদে পোলাও-কোরমা রান্না, কোরবানির ঈদের মাংস রান্না এবং নতুন কাপড় উপহার দিয়ে রোগীদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করা হয়।

‘বলা যায়, তাদের কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হচ্ছে না’

আলবাবের কথায়, ‘আলোক নিবাসের সবচেয়ে বড় সার্থকতা এর পরিচ্ছন্নতা, পুষ্টিকর খাবার এবং সুশৃঙ্খল জীবনযাপন। ব্যবহারে আমরা যেমন আন্তরিক, নিয়মের ক্ষেত্রে তেমনই অবিচল; এখানে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় চলবে না। আমি কর্মীদের সবসময় মনে করিয়ে দিই—তোমরা কোনো বাণিজ্যিক ব্যবসার মুনাফা থেকে বেতন পাও না, মানুষের দেওয়া অনুদান থেকে তোমাদের বেতন হয়। সুতরাং সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে মানুষের সেবা করো।’

১১ বছরের শিশু রায়হান প্রায় দুই বছর ধরে ব্লাড ক্যানসারের সাথে লড়াই করছে। কিন্তু রায়হানের সদা হাস্যোজ্জ্বল ও চঞ্চল মুখ দেখলে বোঝার উপায় নেই তার শরীরের ভেতরে কী মারণব্যাধি বয়ে বেড়াচ্ছে সে। রায়হানের মা আকলিমা আক্তার (ছদ্মনাম) জানান, ‘এখানকার সুন্দর পরিবেশের কারণে ছেলের মনও ভালো থাকে। এখানে আরও অনেক বাচ্চা আছে, ওদের সাথে ও খেলাধুলা করে। সবাই ওকে খুব ভালোবাসে ও আদর করে। সম্পূর্ণ বিনা পয়সায় এমন যত্ন আর কোন হাসপাতাল দিত?’

এখানে থাকা-খাওয়া বাবদ রোগীদের কোনো অর্থই গুনতে হয় না। এ প্রসঙ্গে আলবাব বলেন, ‘আমরা রোগীদের ফ্রিতে সেবা দিচ্ছি—এভাবে বলতে চাই না। বলা যায়, তাদের কাছ থেকে আমরা কোনো খরচ নিচ্ছি না। বর্তমানে আমাদের দুই শতাধিক নিয়মিত অনুদানকারী রয়েছেন। তাদের সহায়তায় কর্মীদের বেতন দেওয়া হচ্ছে এবং যাবতীয় খরচ মেটানো হচ্ছে।’

বর্তমানে মানিকগঞ্জে 'ক্যানসার ভিলেজ' মডেলে একটি স্থায়ী 'আলোক বসতি' গড়ে তোলার কাজ চলছে। সেই পাঁচ বিঘা জমিটি কেনা হয়েছিল মূলত বীর প্রতীক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোদাচ্ছির হোসেন খানের অনুদানের অর্থে। সেখানে ১২০ শয্যাবিশিষ্ট 'আলোক বসতি'র পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক থাকবে। ঢাকার ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিতেই এ উদ্যোগ। আলবাবের স্বপ্ন, 'আমি চাই এটি এমন এক সফল মানবিক মডেল হয়ে উঠুক, যেন ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে এমন 'আলোক বসতি' গড়ে ওঠে।'

আলোক নিবাসের পাশাপাশি বাংলাদেশ ক্যানসার এইড ট্রাস্টের (ব্যানক্যাট) রয়েছে 'আলোক কাঁথা' নামের একটি বিশেষ প্রকল্প। চিকিৎসাধীন রোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অবসর সময়ে পরিত্যক্ত সুতি কাপড় দিয়ে হাতে নানা ধরনের জিনিস তৈরি করেন। জীবনের সবচেয়ে দুঃসহ সময় পার করা এই মানুষগুলো যেন সেলাইয়ের কাজের মাধ্যমে কিছুটা মানসিক স্বস্তি ও সান্ত্বনা খুঁজে পান, সেটাই এর মূল উদ্দেশ্য। এখানে মূলত জায়নামাজ, নকশিকাঁথা, ডায়েরির কভার ইত্যাদি তৈরি করা হয়। তাদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিয়ে এসব পণ্য সংগ্রহ করা হয় এবং তা বাজারে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে সুপারশপ 'ইউনিমার্ট'-এ সীমিত পরিসরে এই 'আলোক কাঁথা'র পণ্য বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে সর্বস্ব হারানো যোদ্ধারা যেন সুস্থ হয়ে আবার সমাজে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন, সেজন্য তাদের পুনর্বাসন নিয়েও কাজ শুরু করেছে ব্যানক্যাট।

২০২১ সালে মাত্র ২৫ শয্যা থেকে শুরু করে আজকের ২০০-এরও বেশি মানুষের এই বিশাল আশ্রয় গড়ে তোলার পথে আলবাবের ব্যক্তিজীবনে বহু ঝড়ঝাপটা এসেছে। কিন্তু মহৎ এই কাজের ক্ষেত্রে তিনি কখনো পিছপা হননি। তিনি অকপটে বলেন, ‘জীবনের কঠিন সেই সাতটি বছর আমি অঝোরে কেঁদেছি। গভীরভাবে ভেবেছি, নিজেকে চিনতে শিখেছি। মাথার ওপর একটা ছাদ ছিল, টেবিলে সাধারণ খাবার ছিল; পোলাও-কোরমা হয়তো জুটত না, কিন্তু ক্ষুধা মেটানোর মতো অন্ন ছিল। আর মনের ভেতর ছিল নিজের ওপর এবং আল্লাহর ওপর অটুট বিশ্বাস।’

সবশেষে তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে নাজমুস আহমেদ আলবাব বলেন, ‘আমি যখন মাঝবয়সে এসে এমন একটি বড় ঝুঁকি নিয়ে এই কাজ শুরু করি, তখন আমার নিজের তিন সন্তান পড়াশোনা করছিল। আমি যদি মাঝবয়সে দাঁড়িয়ে এমন সাহস দেখাতে পারি, তবে তরুণরা কেন নয়? আমি মনি করি সাহস, আত্মবিশ্বাস আর বিচক্ষণতা—এই তিনটি গুণ যদি তোমার ভেতরে থাকে, তবে তুমিও সমাজের জন্য ভালো কিছু করতে পারবে।’ 

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

আরও

ভয়ের পরিবেশ যেন সাংবাদিকদের নিত্যসঙ্গী

অন্যান্য

ভয়ের পরিবেশ যেন সাংবাদিকদের নিত্যসঙ্গী

গত বছরের ৩০ নভেম্বর। আন্তসীমান্ত মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান নিয়ে প্রতিবেদন করার জন্য পরিচিত একটি আইপি টেলিভিশন চ্যানেলের সা...

২০২৬-১১-০২ ১২:৪৩

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো ডাকাতি, ৬৩০ কোটি ডলার চুরির দাবি বাইন্যান্সের

অন্যান্য

নেপথ্যে উত্তর কোরিয়া ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো ডাকাতি, ৬৩০ কোটি ডলার চুরির দাবি বাইন্যান্সের

বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্স জানিয়েছে, হ্যাকাররা তাদের ওয়ালেট থেকে প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার মূল্যের...

২০২৬-১১-০১ ১৮:১২

দিল্লির ভিসা-দেয়ালে আটকে ইউরোপের  শ্রমবাজার, সুযোগ নিচ্ছে অন্যরা

অন্যান্য

দিল্লির ভিসা-দেয়ালে আটকে ইউরোপের শ্রমবাজার, সুযোগ নিচ্ছে অন্যরা

গ্রিসের একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়েছিলেন ইমন মিয়া। নিয়োগকর্তার কাছ থেকে ওয়ার্ক পারমিটও মিলেছিল। বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতিও...

২০২৬-১১-০১ ১২:৩৭

সরকারি পদ আর বিক্রির পণ্য নয়, চাই স্বচ্ছ পদায়নব্যবস্থা

অন্যান্য

সরকারি পদ আর বিক্রির পণ্য নয়, চাই স্বচ্ছ পদায়নব্যবস্থা

সরকারি চাকরিতে কে কোথায় নিয়োগ পাবেন, কোন কর্মকর্তা কোন পদে পদায়িত হবেন কিংবা কার ভাগ্যে জুটবে লাভজনক কর্মস্থল—এসব সিদ...

২০২৬-১০-২৪ ১৫:৫৭

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর চিঠি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন

অন্যান্য

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর চিঠি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর প্রবাসীদের সুরক্ষা এবং বিপদে পড়া নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ দূ...

২০২৬-১০-২৪ ১৫:৫৪

পিএইচপিতে কী ত্রুটি ছিল, কেন বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইট বন্ধ করতে হলো?

অন্যান্য

পিএইচপিতে কী ত্রুটি ছিল, কেন বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইট বন্ধ করতে হলো?

হঠাৎ করেই নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়ল ইন্টারনেটের একটি বড় অংশ। কারণ, ওয়েবসাইট চালানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রামিং ভাষা পিএই...

২০২৬-১০-২২ ১৫:৪৮