জ্যোতির্বিদ্যা অনুযায়ী, এ বছরের পূর্ণিমা তিথি শুরু হয়েছে বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) রাত ৯টা ১২ মিনিটে এবং শেষ হবে শুক্রবার রাত ১০টা ৫২ মিনিটে। এই তিথিতেই উদযাপিত হবে বৌদ্ধদের পবিত্রতম দিনটি।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনে একসঙ্গে সংঘটিত হয়েছিল গৌতম বুদ্ধ-এর জীবনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা- জন্ম, বোধিলাভ (জ্ঞানপ্রাপ্তি) এবং মহাপরিনির্বাণ। বৌদ্ধরা মনে করেন, মানব ইতিহাসে এ এক বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ সমাপতন।
ঐতিহাসিক তথ্যে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ৫৬৩ সালে বর্তমান নেপালের লুম্বিনী-তে রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সিদ্ধার্থ গৌতম। তাঁর পিতা ছিলেন রাজা শুদ্ধোধন এবং মাতা মায়াদেবী। রাজকীয় জীবনের ভোগ-বিলাস ছেড়ে ২৯ বছর বয়সে মানবজীবনের দুঃখের কারণ অনুসন্ধানে গৃহত্যাগ করেন তিনি- যা ‘মহাভিনিষ্ক্রমণ’ নামে পরিচিত।
ছয় বছর কঠোর তপস্যার পর ভারতের বিহারের বোধগয়া-য় বোধিবৃক্ষের নিচে ধ্যান করে তিনি বোধিলাভ করেন এবং ‘বুদ্ধ’- অর্থাৎ জাগ্রত পুরুষ- হিসেবে পরিচিতি পান। এরপর প্রায় ৪৫ বছর তিনি মানবকল্যাণের বার্তা প্রচার করেন। জীবনের শেষ সময়ে উত্তর প্রদেশের কুশিনগর-এ তিনি মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন।
বৌদ্ধ ধর্মের মূল দর্শন ‘চতুরার্য সত্য’- দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখ নিরোধ এবং নিরোধের পথ- মানবজীবনের বাস্তবতা ও মুক্তির দিশা তুলে ধরে। পাশাপাশি ‘আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ’ অনুসরণের মাধ্যমে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির শিক্ষা দিয়েছেন বুদ্ধ।
বাংলাদেশে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ মূলত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য তিন জেলায় বসবাস করলেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এই উৎসব পালিত হয় ব্যাপক ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে। ভোর থেকেই বৌদ্ধ বিহারগুলোতে প্রার্থনা, ধ্যান, ধর্মদেশনা ও ত্রিপিটক পাঠের আয়োজন করা হয়। ভক্তরা ফুল, ধূপ ও প্রদীপ দিয়ে বুদ্ধমূর্তির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
দিনব্যাপী চলে দান-ধ্যান ও সেবামূলক কার্যক্রম। অসহায়দের মাঝে খাবার ও বস্ত্র বিতরণ করা হয়। অনেকেই এদিন নিরামিষ আহার গ্রহণ করেন। সন্ধ্যায় বিহার ও ঘরে ঘরে প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতীকী বার্তা তুলে ধরা হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে দিনটি পায় বাড়তি মাত্রা। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, ধর্মীয় আচার এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাকে অংশগ্রহণ উৎসবকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ভিন্ন ভিন্ন নামে পালিত হয় এই উৎসব। শ্রীলঙ্কায় ‘ভেসাক’, থাইল্যান্ডে ‘ভিসাখ বুচা’ এবং জাপানে ‘হানামাৎসুরি’ নামে পরিচিত এ দিনটি এখন আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ উৎসব হিসেবেও স্বীকৃত।
ধর্মীয় অনুশাসনের বাইরে বুদ্ধ পূর্ণিমা মানবজাতির জন্য এক সার্বজনীন বার্তা বহন করে- অহিংসা, করুণা, সংযম ও জ্ঞানের পথে চলার আহ্বান। বৌদ্ধদের বিশ্বাস, এই দিনে সৎকর্ম, ধ্যান ও দানের মাধ্যমে অর্জিত পুণ্যের ফল বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
এ প্রেক্ষাপটে আগামীকাল দেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়সহ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ শান্তি, মৈত্রী ও মানবকল্যাণের বার্তা নিয়ে উদযাপন করবে পবিত্র বুদ্ধ পূর্ণিমা।