চার বিমান, এক অভূতপূর্ব হামলা
সকাল ৭টা ৫৯ মিনিটে বোস্টন থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসগামী আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১১ উড্ডয়ন করে। এর কিছুক্ষণ পর একই রুটে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১৭৫ আকাশে ওঠে। ওয়াশিংটন থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসের পথে যায় ফ্লাইট ৭৭ এবং নিউয়ার্ক থেকে সান ফ্রান্সিসকোগামী ফ্লাইট ৯৩। চারটি বিমানই পরে ছিনতাইকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে প্রথম বিমানটি নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত করে। প্রথমে অনেকেই এটিকে দুর্ঘটনা ভেবেছিলেন। কিন্তু ১৭ মিনিট পর দ্বিতীয় বিমানটি দক্ষিণ টাওয়ারে আঘাত হানলে পরিষ্কার হয়ে যায়—এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, সমন্বিত হামলা।
এরপর আঘাত আসে ওয়াশিংটনে। সকাল ৯টা ৩৭ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৭৭ পেন্টাগনে আছড়ে পড়ে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তরের একটি অংশ মুহূর্তে আগুন ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
শেষ বিমানটির গল্প
চতুর্থ বিমান, ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৯৩, অন্য তিনটির মতো লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারেনি। বিমানের যাত্রীরা ফোনে স্বজনদের কাছ থেকে জানতে পারেন নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে কী ঘটেছে। এরপর কয়েকজন যাত্রী ছিনতাইকারীদের প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্ত নেন।
সকাল ৯টা ৫৮ মিনিটের দিকে শুরু হয় তাদের পাল্টা আক্রমণ। মাত্র কয়েক মিনিট পর ১০টা ২ মিনিটে বিমানটি পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের কাছে একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। বিমানের কেউ বেঁচে না থাকলেও যাত্রীদের প্রতিরোধের কারণে ছিনতাইকারীদের নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে বিমানটি পৌঁছাতে পারেনি।
কয়েক ঘণ্টায় বদলে গেল আমেরিকা
ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুটি টাওয়ার ধসে পড়ে। নিউইয়র্কের আকাশ ঢেকে যায় ধোঁয়া ও ধুলায়। হাজারো মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ছুটতে থাকেন। দমকলকর্মী, পুলিশ ও উদ্ধারকর্মীরা বিপদের মধ্যেও ভবনের ভেতরে ঢুকে মানুষকে বের করে আনার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন।
সেদিন শুধু ভবন ধ্বংস হয়নি; ভেঙে পড়েছিল আমেরিকার নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের আত্মবিশ্বাসও। বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, আকাশপথ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। পরে বিমানবন্দর নিরাপত্তা, যাত্রী তল্লাশি ও ককপিট নিরাপত্তায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। গড়ে ওঠে পরিবহন নিরাপত্তা প্রশাসনসহ নতুন নিরাপত্তা কাঠামো।
এরপর শুরু হয় ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’
৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি আমূল বদলে যায়। আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু হয়। পরে ২০০৩ সালে ইরাকে আক্রমণ চালায় যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এসব যুদ্ধের মানবিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য ছিল বিপুল। ২০১১ সালে পাকিস্তানে অভিযানে নিহত হন আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন। কিন্তু ততদিনে ৯/১১-এর প্রভাব আমেরিকার সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূর ছড়িয়ে গেছে।
দেশের ভেতরেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা অভূতপূর্বভাবে শক্তিশালী করা হয়। নজরদারি বাড়ে, নতুন আইন আসে, গড়ে ওঠে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কাঠামো। একই সঙ্গে মুসলিম ও মধ্যপ্রাচ্যীয় বংশোদ্ভূত মানুষের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও সন্দেহের ঘটনাও বাড়ে—যা ২৫ বছর পরও ৯/১১-এর অন্যতম বিতর্কিত উত্তরাধিকার হিসেবে আলোচিত।
২৫ বছর পরও শেষ হয়নি গল্প
আজ নিউইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরোতে দাঁড়িয়ে টুইন টাওয়ারের জায়গায় দেখা যায় দুটি বিশাল জলাধার। চারপাশে খোদাই করা নিহতদের নাম। এটি এখন শুধু একটি স্মৃতিসৌধ নয়; প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ৯/১১-এর কথা মনে করিয়ে দেওয়ার এক নীরব পাঠশালা।
তবে ৯/১১-এর ক্ষত কেবল স্মৃতিসৌধে সীমাবদ্ধ নয়। হামলার পর উদ্ধার ও ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কারে কাজ করা বহু মানুষ পরবর্তী বছরগুলোতে নানা অসুস্থতায় ভুগেছেন। বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের ধুলার সঙ্গে যুক্ত রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসা ও সহায়তার প্রয়োজন আজও শেষ হয়নি।
আর সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটেছে স্মৃতিতে। ২০০১ সালের সেই দিনের প্রত্যক্ষদর্শীরা এখন বয়সী হচ্ছেন। অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ ৯/১১ দেখেছে শুধু বই, ছবি, ভিডিও কিংবা পরিবারের গল্পে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—তাদের কাছে এটি আর কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়, ইতিহাসের একটি অধ্যায়।
২৫ বছর পরও তাই ৯/১১-এর প্রশ্ন শুধু ‘সেদিন কী ঘটেছিল?’ নয়। বরং প্রশ্ন হলো—সেই দিনের পর পৃথিবী কতটা বদলেছে, কী শিখেছে, আর কোন ভুলগুলো এখনো থেকে গেছে?
৯/১১ হয়তো একটি দিনের নাম। কিন্তু তার ছায়া আজও বিশ্ব রাজনীতি, নিরাপত্তা, যুদ্ধ, ভ্রমণ এবং মানুষের স্মৃতির ওপর বিস্তৃত। আর নিহত প্রায় ৩ হাজার মানুষের জন্য ১১ সেপ্টেম্বর আজও একটাই বার্তা বহন করে—ভুলে যাওয়া নয়, মনে রাখা।