কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সাথে ইসরায়েলের দ্বিপাক্ষিক ও সামরিক সম্পর্ক এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে একে অপরকে ‘কৌশলগত ভাই’ বা অবিচ্ছেদ্য মিত্র হিসেবে উপস্থাপন করার নীতি গ্রহণ করেছে দেশ দুটি। তবে এই সমীকরণের সমান্তরালে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের নিয়ে ক্ষমতাসীনদের কিছু নীতি ও বক্তব্য মুসলিম বিশ্বে, বিশেষ করে প্রতিবেশী বাংলাদেশে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ইসরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান আগ্রাসনের মুখে ভারত-ইসরায়েলের এই ঘনিষ্ঠতা এবং একই সাথে মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই এই অঞ্চলের জনমানসে একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব ফেলছে।
বৈশ্বিক এই মেরুকরণের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরেও হঠাৎ কিছু উগ্রপন্থী ও মৌলবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা ও উসকানিমূলক বক্তব্য চোখে পড়ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিকভাবে মুসলিম নিপীড়নের ঘটনাগুলোকে পুঁজি করে স্থানীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সমাবেশের আড়ালে ছড়িয়ে দেওয়া এই ধরনের উগ্র বার্তা দেশের অভ্যন্তরীণ অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে। অতীতেও দেখা গেছে, বৈশ্বিক কোনো সংকটের অজুহাতে স্থানীয় উগ্রবাদীরা জলঘোলা করার অপচেষ্টা চালিয়েছে।
বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি অবস্থানে রয়েছে। একদিকে ভারত-ইসরায়েল অক্ষের উদীয়মান প্রভাব, অন্যদিকে দেশের ভেতরে উগ্রবাদের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা; সব মিলিয়ে বাংলাদেশ সরাসরি কোনো সামরিক হুমকির মুখে না পড়লেও, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
এই ঝুঁকিগুলো মূলত তিন স্তরের। উগ্রবাদী বক্তব্যের জেরে দেশের ভেতরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি হতে পারে। অভ্যন্তরীণ উগ্রবাদ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বিদেশি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশ নেতিবাচক ধাক্কা খেতে পারে। প্রতিবেশীদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও উগ্রবাদের পাল্টা প্রভাব হিসেবে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বর্তমান এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার তথা রাষ্ট্রযন্ত্রকে এখনই জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের জন্য বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক। দেশের ভেতরে যারা ধর্মীয় উসকানি দিয়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে, তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো উসকানিমূলক প্রোপাগান্ডা ও গুজব প্রতিরোধে সাইবার নিরাপত্তা সেলকে আরও সক্রিয় করতে হবে। ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি মুসলিম বিশ্ব এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের নিজস্ব অসাম্প্রদায়িক ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে হবে। উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেশের সব স্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
ইতিহাস সাক্ষী, বাংলাদেশ সব সময়ই উগ্রবাদ ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে থেকেছে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক যে সমীকরণ, তাতে সামান্যতম উদাসীনতাও দেশের জন্য বড় বিপদের কারণ হতে পারে। তাই ভূরাজনৈতিক এই চাল চালার সময়ে বাংলাদেশকে নিজের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখতে সর্বোচ্চ সতর্ক চোখ রাখতে হবে।