অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বাজেট কেবল প্রথাগত কোনো বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব বা আর্থিক পরিকল্পনা নয়; এটি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের এক বড় পরীক্ষা।
গত কয়েক বছরে করোনা-পরবর্তী বৈশ্বিক ধাক্কা, ইউক্রেন যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা দেশের অর্থনীতিকে খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) মনে করছে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে পড়লেও ধীরে ধীরে তা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ের দুর্বল গতি এবং ব্যাংকিং খাতের পুঞ্জীভূত ঝুঁকি অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে বলে আইএমএফ সতর্ক করেছে।
বর্তমানে দেশের সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম মূল্যস্ফীতি। খাদ্যপণ্য, পরিবহন, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের লাগামহীন দাম বৃদ্ধির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরেও মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে ৯ শতাংশের কাছাকাছি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকতে পারে। এর ওপর সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্য পুনরায় বৃদ্ধি করায় পরিবহন ও উৎপাদন খাতে নতুন করে চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের ধারণা, এবারের বাজেটে সরকারের সামনে তিনটি প্রধান লক্ষ্য থাকবে; মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি। এ লক্ষ্যে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বড় বরাদ্দের প্রস্তাব আসতে পারে। বিশেষ করে দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য খাদ্য সহায়তা ও ভর্তুকি বাড়ানোর জন্য সরকারের ওপর একধরনের সামাজিক চাপ রয়েছে।
তবে বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর অর্থায়ন বা সম্পদ সংগ্রহ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত সর্বনিম্ন পর্যায়ের। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরেই কর প্রশাসনের সংস্কার এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে আসছে।
দেশের ব্যাংকিং খাতের লাগামহীন খেলাপি ঋণ, তীব্র তারল্য সংকট এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা এখন অর্থনীতির জন্য এক নীরব ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইএমএফ স্পষ্ট জানিয়েছে, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ব্যাংকিং খাতে কঠোর সংস্কার, বিশেষ করে বড় ব্যাংকগুলোর সম্পদ মূল্যায়ন, স্বচ্ছতা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি জোরদার করা জরুরি।
পাশাপাশি, গত এক দশকে মেগা প্রকল্পগুলোর (যেমন: পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ইত্যাদি) দ্রুত বাস্তবায়ন দেশের অবকাঠামো খাকে শক্তিশালী করলেও, এখন বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ইতিমধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। যদিও ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখনও ঝুঁকিসীমার নিচে রয়েছে, তবু আগামী দিনগুলোতে ঋণ ব্যবস্থাপনা সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হবে।
শত সংকটের মাঝেও দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে টিকে আছে প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) ও তৈরি পোশাক শিল্প। বিশ্ববাজারে মন্দা সত্ত্বেও তৈরি পোশাক খাত থেকেই দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে। এই শিল্প খাতকে সচল রাখতে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক বড় প্রণোদনা প্যাকেজও ঘোষণা করেছে।
তবে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণ যেমন দেশের জন্য গর্বের, তেমনি এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বেশ কিছু শুল্কমুক্ত সুবিধা উঠে যাবে। ফলে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক টেকসই করতে শিল্পায়ন, প্রযুক্তি খাত ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
বাজেট সামনে রেখে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন খুবই স্পষ্ট, বাজারদর কি কমবে? কর্মসংস্থান কি বাড়বে? আয় ও জীবনযাত্রার মান কি উন্নত হবে? অর্থনীতিবিদদের মতে, সংকটের এই সময়ে কেবল একটি বড় অঙ্কের ও উচ্চাভিলাষী বাজেট ঘোষণা করলেই লক্ষ্য অর্জিত হবে না। ২০২৬ সালের বাজেটের সফলতা ও সার্থকতা নির্ভর করবে সম্পূর্ণভাবে এর কার্যকর বাস্তবায়ন, আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সুশাসন নিশ্চিতকরণের ওপর।