শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাতে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুর শেষ লড়াই
রাইয়ান বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার বেতগাড়ী এলাকার বাসিন্দা আতিকুল ইসলামের সন্তান। হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত ১৭ এপ্রিল তাকে ভর্তি করা হয়। আগে থেকেই সে সেরিব্রাল পালসি, ব্রঙ্কো নিউমোনিয়া ও হার্ট ফেইলরের মতো গুরুতর শারীরিক সমস্যায় ভুগছিল।
পরবর্তীতে জ্বর ও শরীরে র্যাশ দেখা দিলে তাকে হামের জন্য নির্ধারিত বিশেষ আইসোলেশন ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
তবে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. মনজুর-এ-মুর্শেদ জানিয়েছেন, এখনো নমুনা পরীক্ষার ফলাফল না আসায় এটিকে নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হিসেবে ঘোষণা করা যাচ্ছে না।
হাসপাতালের চিত্র: চাপের মুখে আইসোলেশন ওয়ার্ড
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হামের পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৫০ শয্যার একটি বিশেষ আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে।
গত ২৯ তারিখ থেকে এখন পর্যন্ত ভর্তি: ১৮৫ জন শিশু
বর্তমানে চিকিৎসাধীন: ৩৮ জন
পরীক্ষার জন্য পাঠানো নমুনা: ১২৩টি
নিশ্চিত হামের পজিটিভ: ৪ জন
এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, উপসর্গের তুলনায় নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা কম হলেও আতঙ্কের মাত্রা অনেক বেশি।
একাধিক মৃত্যু, বাড়ছে উদ্বেগ
রাইয়ানের আগেও একই ওয়ার্ডে হুমায়রা নামে ১০ মাস বয়সী আরেক শিশু মারা যায়, যার ক্ষেত্রেও হামের উপসর্গ ছিল।
এছাড়া ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ১ জন শিশুর মৃত্যু ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে, যে ৭ এপ্রিল ভর্তি হয়ে ৯ এপ্রিল মারা যায়।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে—
উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু: ২ জন শিশু
নিশ্চিত হামে মৃত্যু: ১ জন শিশু
বড় সংকট: নেই শিশুদের আইসিইউ সুবিধা
চিকিৎসা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা সামনে এসেছে এই পরিস্থিতিতে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে—
কোনো পেডিয়াট্রিক আইসিইউ (PICU) নেই
নেই নিওনেটাল আইসিইউ (NICU) সুবিধাও
ফলে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের উন্নত চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এ সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য সচিবের কাছে দ্রুত প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জনবলসহ একটি পেডিয়াট্রিক আইসিইউ চালুর আবেদন করা হয়েছে।
বিশ্লেষণ: আতঙ্ক নাকি সতর্কবার্তা?
বর্তমান পরিস্থিতি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—
উপসর্গ বেশি, কিন্তু নিশ্চিত রোগী কম—তাহলে কি অন্য কোনো ভাইরাল সংক্রমণও ছড়াচ্ছে?
শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত নিবিড় চিকিৎসা সুবিধা না থাকায় কি মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে?
গ্রামাঞ্চলে টিকাদান কাভারেজ কতটা কার্যকর?
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের মতো সংক্রামক রোগে দ্রুত শনাক্তকরণ, টিকাদান এবং আইসোলেশন অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে গুরুতর রোগীদের জন্য আইসিইউ সুবিধা না থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
করণীয়: এখনই সতর্কতা জরুরি
এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের জন্য কিছু জরুরি পরামর্শ—
শিশুর জ্বর, র্যাশ বা কাশি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন
টিকাদান সম্পূর্ণ নিশ্চিত করুন
আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখুন
ভিড় এড়িয়ে চলুন
বগুড়ার এই পরিস্থিতি শুধু একটি জেলার সংকট নয়, বরং দেশের শিশুস্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি সতর্ক সংকেত। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এটি বড় আকারের জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিতে পারে। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ—স্বাস্থ্যসেবা, সচেতনতা এবং অবকাঠামো উন্নয়ন—এই তিনটিই হয়ে উঠেছে সময়ের দাবি।