মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল শুক্রবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে মধ্যস্থতাকারীদের জানিয়ে দিয়েছে যে তারা ইসলামাবাদে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসতে রাজি নয়। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের শর্তগুলোকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছে। এই কূটনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে তুরস্ক ও মিসর এখন কাতার বা ইস্তাম্বুলকে বিকল্প আলোচনার স্থান হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে কাতার এই গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতার ভূমিকা পালনে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছে। মার্কিন ঘাঁটি ও ইরানি হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া কাতার জানিয়েছে, তারা এই মুহূর্তে এমন সংবেদনশীল আলোচনায় যুক্ত হতে আগ্রহী নয়।
মধ্যস্থতা যখন থমকে আছে, রণক্ষেত্রে তখন উত্তেজনা চরমে। শুক্রবার প্রথমবারের মতো ইরানি ভূখণ্ডে একটি মার্কিন এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। একজন ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করা গেলেও অন্যজন এখনও নিখোঁজ।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এনবিসি নিউজকে বলেছেন, যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা শান্তি আলোচনায় কোনও প্রভাব ফেলবে না। তিনি বলেন, ‘না, মোটেও না। এটি যুদ্ধ।’ তবে নিখোঁজ সেনার কোনও ক্ষতি হলে যুক্তরাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়ে এখনই কিছু বলতে রাজি হননি তিনি। অন্যদিকে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম কেএএন জানিয়েছে, ইসরায়েল আরও অন্তত দুই সপ্তাহ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমনকি নিজেদের স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবসগুলোও যুদ্ধের মধ্যে পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের এখনই হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার কোনও সম্ভাবনা নেই। কারণ বিশ্বের এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথটিই এখন ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে তেহরানের একমাত্র শক্তিশালী হাতিয়ার। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, ইরান এই পথটি ব্যবহার করে তেলের দাম চড়া রাখবে যাতে ট্রাম্প দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে বাধ্য হন।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্টের পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র ঠেকাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের হাতে বিশ্ব অর্থনীতি ধ্বংসের অস্ত্র তুলে দিয়েছে।’ ট্রাম্প দাবি করেছেন যে একটু সময় পেলে তিনি সহজেই এই পথ উন্মুক্ত করে ‘তেল দখল ও ভাগ্য বদল’ করবেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পথ উদ্ধারে শক্তি প্রয়োগ করলে যুক্তরাষ্ট্র একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে।
সাবেক সিআইএ প্রধান বিল বার্নস এক পডকাস্টে বলেছেন, যুদ্ধের পরও ইরান এই প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে চাইবে। কারণ যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের জন্য তারা বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে মাশুল আদায় করতে চায়। এটিই এখন আলোচনার সবচেয়ে কঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ইরান কেবল তাদের ‘মিত্র’ মনে করা জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করতে দিচ্ছে। বৃহস্পতিবার ওমানের তিনটি তেলের ট্যাংকার, ফ্রান্সের একটি কন্টেইনার জাহাজ এবং জাপানের একটি গ্যাস ক্যারিয়ার এই পথ অতিক্রম করেছে।
ফরাসি জাহাজটি ইরানি জলসীমায় প্রবেশের আগে তাদের গন্তব্যের সংকেত বদলে ‘ফ্রান্সের মালিকানা’ লিখে নিজেদের জাতীয়তা নিশ্চিত করে। জাপানের মিতসুই ওএসকে লাইন্স নিশ্চিত করেছে যে তাদের একটি এলএনজি ট্যাংকার যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম জাপানি জাহাজ হিসেবে নিরাপদে এই পথ পাড়ি দিয়েছে। তবে এখনও প্রায় ৪৫টি জাপানি জাহাজ এই অঞ্চলে আটকা পড়ে আছে। অনেক জাহাজ ধরা পড়া এড়াতে তাদের ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ করে যাতায়াত করছে। যারা পার হতে পারছে, তারা জাহাজের গায়ে ‘ইন্ডিয়া শিপ ইন্ডিয়া ক্রু’ বা চীনে গন্তব্য লিখে ইরানিদের সংকেত দিচ্ছে।