পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসম্পদ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় ১৯৮৫ সালে নড়াইল সদর উপজেলার কমলাপুর ও গন্ধব্যখালী গ্রামে দুটি সেচ পাম্প বসানো হয়েছিল।
প্রকল্পের আওতায় কমলাপুর এলাকায় সাড়ে আট কিলোমিটার দীর্ঘ সেচখাল খনন করা হয়।
এ ছাড়া গন্ধব্যখালী এলাকায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সেচখাল খনন করা হয়। খাল দুটি দিয়ে পানিপ্রবাহ সরাসরি কৃষকদের জমিতে পৌঁছায়। পাঁচ কোটি ১২ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে পরিচালিত প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল এক হাজার ৩৭ হেক্টর জমিতে কম খরচে কৃষকরা তাদের জমিতে সেচ সুবিধা পাবেন। কিন্তু ২০১৮ সালে সেচ পাম্প দুটি বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর ২০১৯ সালে সেচপাম্প মেরামতের জন্য ৩৫ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে সেটি আর বাস্তবায়িত হয়নি।
গত সোমবার (৩০ মার্চ) কমলাপুর সেচ এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে সেখানকার সেচ পাম্পটি। প্রকল্পের ফটকটি অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে।
অফিস কক্ষে তালা ঝুলছে। বারান্দায় ময়লার স্তূপ। শৌচাগারগুলোর দরজা ভাঙা। সেচ এলাকাজুড়ে সুনসান নীরবতা।
অনেক ডাকাডাকির পর অফিসের একটি কক্ষ থেকে বের হন ইয়ামিন তরফদার নামের এক কর্মী।
নিজেকে গেট অপারেটর (আউটসোর্সিং নিয়োগপ্রাপ্ত) দাবি করে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে পাম্প বন্ধ থাকায় এখানে কোনো কর্মকর্তা আসেন না। স্থানীয় কিছু লোক এসে অনেক সময় মাদকের আখড়া বসায়। আমি একা থাকি, ভয়ে কাউকে কিছু বলতে পারি না। তবে মাঝেমধ্যে তাদের এখান থেকে চলে যেতে বলি।’
স্থানীয় কৃষকর সৌমেন জানান, সেচপাম্প দুটি ছিল কম খরচে তাদের জন্য সহজ পানির উৎস। চিত্রা নদী থেকে সরাসরি জমিতে পানি সরবরাহ করা হতো এ সেচপাম্পের মাধ্যমে। ফলে তারা কম খরচে তিনটি ফসল উৎপাদন করার সুযোগ পেতেন। কিন্তু টানা আট বছর ধরে সেচ পাম্প দুটি বন্ধ রয়েছে। ফলে জমিতে সেচের জন্য এখন ডিজেলচালিত শ্যালোমেশিনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে কৃষকদের।
কমলাপুর গ্রামের মিলন ঘোষ বলেন, একসময় সেচপাম্প থেকে জমিতে বিনামূল্যে সেচ সুবিধা পেতাম। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড সমিতি চালু করে। এরপর বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার অজুহাতে টাকা নেওয়া শুরু করল। তখন বিদ্যুৎ বিল বাবদ তিন শতক জমিতে ৯ টাকা দিতাম। পরে জানতে পারলাম বিদ্যুৎ বিল হাজার হাজার টাকা বাকি পড়ে গেছে। তারপর থেকে সেচ দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এখন শুনছি পাম্প নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।
কৃষকরা আরো জানান, বর্তমানে ডিজেলচালিত শ্যালোমেশিনে এক কানি জমিতে সেচ দিতে ১০০ টাকা খরচ হচ্ছে। সেচ প্রকল্প চালু থাকার সময় কম খরচে ধান, পাট, গমের জমিতে পানি দেওয়া যেত। এখন শ্যালোমেশিন দিয়ে পানি দিতে অনেক টাকা খরচ হচ্ছে তাদের।
এক একর জমিতে এ বছর ধানের আবাদ করেছেন সদর উপজেলার আউড়িয়া ইউনিয়নের নাকশি গ্রামের মাসুম খন্দকার। ডিজেলচালিত স্যালোমেশিন চালিয়ে নিজ জমিতে সেচ দিচ্ছিলেন তিনি। এ সময় কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, নাকশি ইউনিয়নের নাকশি, কমলাপুর ও ঘোষপুর গ্রামের বাসিন্দাদের জমি রয়েছে মাঠটিতে। সেচ পাম্প চালু থাকায় তিন গ্রামের কৃষক কম খরচে ধান, পাট, গম ও অন্যান্য ফসলের জন্য জমিতে সেচ দিতে পারতেন। পাম্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিন গ্রামের কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। নতুন করে সংস্কার করে সেচ পাম্প চালু করার দাবি জানান এই কৃষক।
নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ কুমার সাহা বলেন, প্রকল্পটির অধীনে দুইটি সেচ পাম্প ছিল। সেচ পাম্প দুটি বিকল হয়ে যাওয়ায় তা মেরামতের জন্য ২০১৮ সালে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। প্রকল্পটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। এটি পুনরায় চালু করতে পারলে ওই এলাকার কৃষি জমিতে কৃষকেরা কম খরচে সেচ সুবিধা পাবে। অকেজো হয়ে পড়ে থাকা সেচ পাম্প দুটি নতুন করে সংস্কারের জন্য পুনরায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের চাহিদা পাঠানো হয়েছে।