১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন বাঙালি জাতি চরম অনিশ্চয়তার মুখে, ঠিক তখনই ২৬ ও ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন মেজর জিয়ার বজ্রকণ্ঠের স্বাধীনতার ঘোষণা দেশের মুক্তিকামী মানুষকে দেখায় নতুন পথ। তার এই সাহসী ঘোষণা অবরুদ্ধ বাঙালি জাতিকে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা ও আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল।
শুধু ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না তিনি। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। তিনি ছিলেন ১নং সেক্টরের কমান্ডার এবং পরবর্তীতে তার নামানুসারে গঠিত প্রথম নিয়মিত সামরিক ব্রিগেড ‘জেড ফোর্সের’ অধিনায়ক। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করে। বিবিসির এক ঐতিহাসিক জরিপে তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালিদের অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি পান।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে যখন রাজনৈতিক আদর্শিক সংঘাত ও সামাজিক বিভাজন তীব্র রূপ নিয়েছিল, তখন জিয়াউর রহমান সামনে নিয়ে আসেন এক যুগান্তকারী দর্শন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’।
তিনি বিশ্বাস করতেন, এ দেশের মানুষের পরিচয় কেবল ভাষাভিত্তিক হতে পারে না; বরং তা হবে স্বাধীন ভূখণ্ড, সার্বভৌম রাষ্ট্র, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের এক সামগ্রিক সমন্বয়। ধর্ম, অঞ্চল বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে এই ভূখণ্ডের প্রতিটি নাগরিক যে প্রথমে একজন ‘বাংলাদেশি’; এই মূলমন্ত্র দিয়ে তিনি পুরো জাতিকে একটি অভিন্ন পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তার এই দর্শন আজও সমান তাৎপর্যপূর্ণ।
১৯৭৫-এর পটপরিবর্তন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পর দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি বাংলাদেশের ষষ্ঠ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তৎকালীন একদলীয় শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন করেন।
রাজনৈতিক দল গঠন, মুক্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশে সুস্থ ধারার রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিত করেন। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (বিএনপি), যা পরবর্তীতে দেশের অন্যতম বৃহৎ ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
জিয়াউর রহমানের অর্থনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল আত্মনির্ভরতা। তিনি বিদেশি সাহায্যনির্ভর মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে ‘উৎপাদনের রাজনীতির’ ডাক দেন। তার বিখ্যাত উক্তি ছিল, ‘দেশকে বাঁচাতে হলে উৎপাদন বাড়াতে হবে।’ গ্রামীণ অর্থনীতি সচল করতে তিনি নিজে কোদাল হাতে নেমে ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচির’ সূচনা করেন। সেচব্যবস্থার আধুনিকায়ন, উন্নত বীজ ও সার বিতরণ এবং সহজ কৃষিঋণের মাধ্যমে তিনি দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার দোরগোড়ায় নিয়ে যান।
রাষ্ট্রনির্ভর অর্থনীতির বাইরে গিয়ে তিনি বেসরকারি খাত ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করেন। আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান দুই স্তম্ভ গার্মেন্টস শিল্প এবং মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির (রেমিট্যান্স) প্রাথমিক নীতিগত ভিত্তি মূলত তার সময়েই স্থাপিত হয়েছিল।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি মুসলিম বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ় করেন এবং ওআইসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থানকে মর্যাদাপূর্ণ করেন।
দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক জটিলতা নিরসনে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি একটি আঞ্চলিক জোটের প্রস্তাব করেন। তার এই দূরদর্শী চিন্তার ফসল হিসেবেই পরবর্তীতে গঠিত হয় দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’।
১৯৮১ সালের মে মাসে এক সরকারি সফরে চট্টগ্রামে যান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ৩০ মে গভীর রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার নির্মম বুলেটের আঘাতে শাহাদাতবরণ করেন এই মহান রাষ্ট্রনায়ক।
তার মৃত্যুর পর তৎকালীন সরকারের তরফ থেকে লাশের সন্ধান মিলে চট্টগ্রামের রাউজানের গভীর জঙ্গলে। তিন দিন পর ঢাকায় যখন তার মরদেহ নিয়ে আসা হয়, তখন শেরেবাংলা নগরের জানাজায় অংশ নিয়েছিল লাখ লাখ শোকার্ত মানুষ। ঢাকার বুকে লাখো মানুষের সেই শোকাতুর উপস্থিতি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায় হিসেবে লিপিবিদ্ধ হয়ে আছে। জাতীয় সংসদ ভবন চত্বরে (বর্তমান জিয়া উদ্যান) তাকে সমাহিত করা হয়।
আজ ৩০ মে, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী। দিনটি উপলক্ষে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো দেশব্যাপী টানা ৮ দিনের নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে দলীয় কার্যালয়গুলোতে দলীয় পতাকা অর্ধনমিত ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। নেতাকর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করেছেন। শেরেবাংলা নগরে শহিদ জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং রাজধানীজুড়ে দুস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী ও বস্ত্র বিতরণ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন দেশের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।