সংকটের শুরু মূলত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমিরের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। তিনি তার বক্তব্যে ইসলামী ব্যাংকের অতীত ও বর্তমানের বিভিন্ন বিষয় এবং ব্যাংকের আমানতকারীদের তারল্য ও নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেন। এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। আমানত নিয়ে শঙ্কিত হয়ে শত শত গ্রাহক ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় টাকা তোলার জন্য ভিড় করতে শুরু করেন।
গত ৩ জুন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখায় টাকা তুলতে এসে গ্রাহকেরা চরম ভোগান্তির শিকার হন। একপর্যায়ে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে গ্রাহকদের বাকবিতণ্ডা শুরু হলে পুলিশ এসে উত্তেজিত গ্রাহকদের ওপর লাঠিচার্জ করে। পুলিশের মারমুখী আচরণের প্রতিবাদে এবং নিজেদের কষ্টার্জিত টাকা ফেরত পাওয়ার দাবিতে ক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা পরদিন ৪ জুন সকাল থেকেই ব্যাংকের সামনে জড়ো হয়ে অনড় অবস্থান নেন। তারা দিনভর সেখানে বসে থেকে তাদের জমানো টাকা ফেরতের দাবি জানান এবং ব্যাংকের বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তাদের তীব্র সমালোচনা করেন।
উদ্ভূত এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকের পূর্বনির্ধারিত সশরীরে উপস্থিতির পরিচালনা পর্ষদ (বোর্ড) সভা বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও আশেপাশের এলাকায় গ্রাহকদের বিক্ষোভের মুখে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে তড়িঘড়ি করে এই বোর্ড মিটিংটি ভার্চুয়ালি (অনলাইন মাধ্যমে) সম্পন্ন করা হয়।
ভার্চুয়াল বোর্ড মিটিং শেষ হওয়ার পরপরই আসে বড় ধাক্কা। ব্যাংকটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) উদ্ভূত পরিস্থিতির দায় নিয়ে পদত্যাগ করেন। এদিকে, আন্দোলনরত গ্রাহকেরা ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যানের ওপরও চরম অনাস্থা প্রকাশ করেছেন। গ্রাহকদের স্পষ্ট দাবি, তারা বর্তমান চেয়ারম্যানকে আর এই পদে দেখতে চান না এবং ব্যাংকের বর্তমান পুরো পর্ষদ ভেঙে দিয়ে আমানতকারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
ইসলামী ব্যাংকের এই সংকটকে কেন্দ্র করে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে ভিন্নধর্মী অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে যে, একটি বিশেষ মহল বা জামায়াত পরিকল্পিতভাবে ইসলামী ব্যাংকটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বা ‘দখল’ করার চেষ্টা চালাচ্ছে, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। অন্যদিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলা হয়েছে, তারা কোনো ব্যাংক দখল করতে চায় না। তবে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর ও সুবিধাভোগীরা এখনো ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসে আছেন। এই ‘ফ্যাসিস্টরা’ কোনোভাবেই ব্যাংকে থাকতে পারবে না এবং ব্যাংকটিকে লুটপাটের হাত থেকে রক্ষা করতেই তারা কথা বলছেন।
বিক্ষুব্ধ গ্রাহকদের কথা অত্যন্ত পরিষ্কার। তারা বলছেন, ‘আমরা কোনো রাজনীতি বুঝি না, জামায়াত-বিএনপি বুঝি না। আমরা চাই আমাদের জমানো টাকার নিরাপত্তা।’ গ্রাহকদের অভিযোগ, ব্যাংকে টাকা তুলতে গেলে তাদের পর্যাপ্ত টাকা দেওয়া হচ্ছে না এবং দিনের পর দিন ঘোরানো হচ্ছে। বর্তমান পর্ষদের অব্যবস্থাপনার কারণেই ব্যাংকটি এই অবস্থায় পৌঁছেছে বলে মনে করেন তারা।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা বাংলাদেশ ব্যাংক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইসলামী ব্যাংক দেশের অন্যতম বড় একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং এর সাময়িক তারল্য সংকট কাটানোর জন্য প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ বা লিকুইডিটি সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক গ্রাহকদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, কোনো গ্রাহকের টাকা খোয়া যাবে না। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা ও পর্ষদে যে পরিবর্তনগুলো আসছে, তা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সম্পন্ন করে দ্রুত ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।