অসংখ্য কালজয়ী প্রেমের গান উপহার দেওয়া এই সাধক শিল্পী বাস্তবে কেমন ছিলেন? একবার এক সাক্ষাৎকারে যখন তাকে প্রশ্ন করা হয় তিনি কার প্রেমে এত দেওয়ানা ছিলেন, সোজা উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমার প্রেমে।’ সেই সাক্ষাৎকারটি তখন সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় দিয়েছিলেন এই বাউল সম্রাট।
তার জীবদ্দশাতেই ‘বন্দে মায়া লাগাইছে’ কিংবা ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’-এর মতো জনপ্রিয় গানগুলোর বহু রিমিক্স ও নতুন সংস্করণ তৈরি হতে শুরু করে। তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের এই রিমিক্স বা পুনর্নির্মাণ নিয়ে বাউল সম্রাটের কোনো ক্ষোভ বা আপত্তি ছিল না— এমনটাও উঠে আসে তার কথায়।
নতুন সংস্করণগুলো নিয়ে সেই সাক্ষাৎকারে জানতে চাওয়া হলে কোনো রাকঢাক ছাড়াই নিজের মতামত জানান শাহ আব্দুল করিম। নতুনরা তার গান কেমন গাইছে—এমন প্রশ্নে সহজ-সরল ভাষায় বাউল সম্রাট উত্তর দেন, ‘আমার থেইকা খারাপও গাইছে, আমার থেইকা ভালোও গাইছে। যে যেভাবে পারার ওসেভাবে গাইছে।’
গান-বাজনার বর্তমান অবস্থা ভালো দিকেই যাচ্ছে বলে তিনি মনে করতেন। তবে নতুনদের উদ্দেশ্যে তার স্পষ্ট বার্তা ছিল গায়কীর শুদ্ধতা বজায় রাখা। কেউ ভুল গাইলে তিনি অভিভাবকের মতো ডেকে সরাসরিই বলতেন, ‘ইডা তো তোমার অইছে না বা (এটা তো তোমার হচ্ছে না)।’ ভালোবাসার সঙ্গেই পরামর্শ দিতেন গান শুদ্ধ করে গাওয়ার। আবার কেউ কথা না শুনলে তা নিয়েও কোনো আক্ষেপ রাখতেন না।
১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন আসাম প্রদেশের সিলেট জেলার দিরাইতে জন্ম নেন শাহ আব্দুল করিম। ছিলেন এক স্বশিক্ষিত সংগীতসাধক। বাউল শাহ ইব্রাহিম মাস্তান বকশ ও সাধক রশীদ উদ্দীনের কাছ থেকে সংগীতের দীক্ষা নেওয়া এই বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ, পাঞ্জু শাহ ও দুদ্দু শাহের দর্শন থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। ভাটি অঞ্চলের দারিদ্র্য ও কৃষিকাজের সমান্তরালে তিনি রচনা করেছেন পাঁচ শতাধিক গান। শরিয়তি, মারফতি, দেহতত্ত্ব ও গণসংগীতের মাধ্যমে তিনি যেমন মানুষের প্রেম-ভালোবাসার কথা বলেছেন, তেমনি সোচ্চার হয়েছেন কুসংস্কার ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। ২০০১ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে।
শাহ আব্দুল করিমের প্রয়াণ দিবসে তার এই উদার ও অকৃত্রিম সুরসাধনাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে সারা দেশের সংগীতপ্রেমী মানুষ। ২০০৯ সালের আজকের এই দিনে ৯৩ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। তবে তিনি চলে গেলেও তার গান আর মুক্তচিন্তার দর্শন রয়ে গেছে চিরভাস্বর হয়ে।