তবে পুনঃনিরীক্ষণের ফল প্রকাশের পরও কোনো শিক্ষার্থী যদি তার ফলাফলে সন্তুষ্ট না হন, তাহলে কি একই উত্তরপত্র আবার পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করা যাবে?
শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, না। একই উত্তরপত্র দ্বিতীয়বার পুনঃনিরীক্ষণের সুযোগ নেই। তবে পুনঃনিরীক্ষণের ফল নিয়ে কোনো শিক্ষার্থী অসন্তুষ্ট হলে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবেন।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ড এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার পুনঃনিরীক্ষণের ফল প্রকাশ করেছে। এর আগে গত ১০ আগস্ট মূল ফল প্রকাশ করা হয়। এরপর ১৭ আগস্ট পর্যন্ত উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করার সুযোগ ছিল।
দ্বিতীয়বার কেন পুনঃনিরীক্ষণ করা যাবে না?
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক জেসমিন তাসলিমা বানূ বিবিসি বাংলাকে বলেন, একটি উত্তরপত্র কয়েকটি ধাপের মূল্যায়ন ও যাচাই শেষে ফল প্রকাশ করা হয়। পুনঃনিরীক্ষণের পর বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী একই খাতা আবার দেখার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, বোর্ডের নির্ধারিত নীতিমালার বাইরে গিয়ে পুনঃনিরীক্ষণের সুযোগ দেওয়া সম্ভব নয়। এরপরও কোনো শিক্ষার্থী ফলাফলে সন্তুষ্ট না হলে তাকে আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে।
একই কথা জানিয়েছেন বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক শরীফ মোর্শেদ রেজা। তিনি বলেন, কোনো শিক্ষার্থী আদালতে রিট করলে এবং আদালত উত্তরপত্র পুনরায় দেখার নির্দেশ দিলে বোর্ড সেই নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বাধ্য।
কীভাবে মূল্যায়ন হয় একটি খাতা?
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, একটি উত্তরপত্র শুরুতেই কয়েকটি ধাপের মধ্য দিয়ে যায়।
প্রথমে পরীক্ষক উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন। এরপর প্রধান পরীক্ষক সেটি যাচাই করেন। পরে নিরীক্ষক নম্বরের হিসাব ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করেন।
এরপর কোনো শিক্ষার্থী পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করলে আরেকজন পরীক্ষকের মাধ্যমে উত্তরপত্র আবার যাচাই করা হয়।
অর্থাৎ, পুনঃনিরীক্ষণ শেষ হওয়ার পর একটি উত্তরপত্র মোট চারটি ধাপের মূল্যায়ন ও যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। এ কারণেই একই খাতা দ্বিতীয়বার পুনঃনিরীক্ষণের সুযোগ রাখা হয়নি বলে জানিয়েছে শিক্ষা বোর্ডগুলো।
এবার রেকর্ডসংখ্যক আবেদন
চলতি বছর দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন।
মূল ফল প্রকাশের পর পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেন ৪ লাখ ২ হাজার ৫১ জন পরীক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ৩০ হাজারের বেশি জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীও ছিলেন।
একজন শিক্ষার্থী একাধিক বিষয়ের উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করতে পারেন। ফলে পরীক্ষার্থীর তুলনায় পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করা উত্তরপত্রের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি।
সব মিলিয়ে লিখিত পরীক্ষার ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৫টি এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৭১টি উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করা হয়। অর্থাৎ মোট ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি উত্তরপত্রের পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন পড়েছে।
ভবিষ্যতে বদলাতে পারে নিয়ম
এবার বিপুলসংখ্যক পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন পড়ায় উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও পুনঃনিরীক্ষণের বর্তমান পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও পুনঃনিরীক্ষণের জন্য নতুন নীতিমালা তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
নতুন নীতিমালায় কোন ধরনের উত্তরপত্র পুনরায় পরীক্ষা করা হবে, কোন ক্ষেত্রে গুরুতর মূল্যায়ন-ত্রুটি বিবেচনায় নেওয়া হবে এবং পরীক্ষকদের যোগ্যতা ও জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।
শিক্ষকদের খাতা মূল্যায়নের মান, আন্ডার মার্কিং বা ওভার মার্কিং হচ্ছে কি না, সেসব বিষয়ও নতুন করে পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
বর্তমান ব্যবস্থায় পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্রে অতিরিক্ত বা কম নম্বর দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে এ ধরনের অনিয়ম নির্ধারণের ক্ষেত্রে তৃতীয় একজন পরীক্ষকের মূল্যায়নের প্রয়োজন হয়।
শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের মতে, উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ চালু করা সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি যথেষ্ট নয়। দেশের প্রচলিত পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়েও নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. আব্দুস সালাম মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা তাত্ত্বিক পরীক্ষা-নির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতিতে একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত সক্ষমতার যথাযথ মূল্যায়ন সবসময় সম্ভব হয় না।