শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে এসএসসি, দাখিল ও এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যায় বড় পরিবর্তন এসেছে। কারণ, ২০২৫ সালে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৯ লাখ ২৮ হাজার ৯৭০ জন, যা ২০২৬ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জনে। অর্থাৎ এক বছরে পরীক্ষার্থী কমেছে প্রায় ৭১ হাজার ৬২৬ জন।
বোর্ডভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, ঢাকা বোর্ডে ২০২৫ সালে পরীক্ষার্থী ছিল ৩ লাখ ৮১ হাজার ৪৮৫ জন, যা ২০২৬ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫০ জনে। একইভাবে রাজশাহী, কুমিল্লা, যশোর, চট্টগ্রাম ও সিলেট বোর্ডেও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। তবে ব্যতিক্রম দেখা গেছে ময়মনসিংহ বোর্ডে, যেখানে ২০২৫ সালের ১ লাখ ৬ হাজার ৮২৫ জন পরীক্ষার্থীর বিপরীতে ২০২৬ সালে পরীক্ষার্থী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৩৫৯ জনে।
আবার মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ২০২৬ সালে পরীক্ষার্থী বেড়েছে (৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ জন)। যেখানে ২০২৫ সালে ছিল ২ লাখ ৯৪ হাজার ৭২৬ জন। অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার্থী ১ লাখ ৪৩ হাজার ৩১৩ থেকে কমে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জনে নেমে এসেছে। জানা গেছে, ২০২৬ সালে সারা দেশে মোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৩ হাজার ৮৮৫টি এবং মোট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩০ হাজার ৬৬৬টি।
এদিকে, ২০২৬ সালের গ্রুপভিত্তিক পরীক্ষার্থীর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসএসসি পরীক্ষায় বিভাগ বা গ্রুপভিত্তিক পছন্দে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈচিত্র্য দেখা গেছে। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর অধীনে বিজ্ঞান বিভাগে মোট ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৭৬৩ জন, মানবিক বিভাগে ৬ লাখ ২৭ হাজার ৪৫১ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ২ লাখ ২১ হাজার ১৮৪ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করছে।
তথ্য বিশ্লেষণ করে আরও দেখা যায়, মানবিক বিভাগে ছাত্রী সংখ্যা ৩ লাখ ৬১ হাজার ১৬৯ জন। আর ছাত্র সংখ্যা ২ লাখ ৬৬ হাজার ২৮২ জন। অর্থাৎ ছাত্রী সংখ্যা ছাত্রদের তুলনায় অনেক বেশি। অন্যদিকে, বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ২ লাখ ৯৩ হাজার ৬৩৭ জন এবং ছাত্রদের অংশগ্রহণ ২ লাখ ৭৬ হাজার ১২৬ জন। এখানেও ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছাত্রদের তুলনায় বেশি। তবে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ছাত্রদের আধিপত্য লক্ষ্য করা গেছে।
তাছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষায় সাধারণ বিভাগে ২ লাখ ৬২ হাজার ৩২০ জন এবং বিজ্ঞান বিভাগে ৪১ হাজার ৫২১ জন শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি (ভোকেশনাল) কোর্সে ১ লাখ ৩২ হাজার ১৯৮ জন এবং দাখিল (ভোকেশনাল) কোর্সে ২ লাখ ৪৬২ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধিত হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, এ বছর মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র রয়েছে ৯ লাখ ৩০ হাজার ৩০৫ জন এবং ছাত্রী রয়েছে ৯ লাখ ২৭ হাজার ৩৯ জন। অর্থাৎ ছাত্রদের সংখ্যা ছাত্রীদের তুলনায় ৩ হাজার ২৬৬ জন বেশি।
এছাড়া বোর্ড অনুযায়ী পরীক্ষার্থীর সংখ্যায় সবচেয়ে বড় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা বোর্ড (৩ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫০ জন)। এর পরেই রয়েছে মাদ্রাসা বোর্ড (৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ জন)। অন্যান্য বোর্ডের মধ্যে রাজশাহী বোর্ডে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৭০৯ জন, কুমিল্লা বোর্ডে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৮১৭ জন, দিনাজপুর বোর্ডে ১ লাখ ৮১ হাজার ৮৫৪ জন এবং চট্টগ্রাম বোর্ডে ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮ জন পরীক্ষার্থী রয়েছে। সবচেয়ে কম পরীক্ষার্থী সিলেট বোর্ডে, যার সংখ্যা ৮৯ হাজার ৪২১ জন।
নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা নিতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি
এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, প্রভাবমুক্ত এবং নকলমুক্ত পরিবেশে সম্পন্ন করতে শিক্ষা প্রশাসন থেকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। পরীক্ষার আগে-পরে যেকোনো ধরনের অনিয়ম রুখতে কেন্দ্রগুলোতে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
সেই সঙ্গে পরীক্ষা চলাকালীন প্রতিটি কেন্দ্রের হলরুম সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। কেন্দ্র সচিবের কক্ষ থেকে সরাসরি এই মনিটরিং করার পাশাপাশি শিক্ষা বোর্ডগুলো থেকেও ডিজিটাল পদ্ধতিতে নজরদারি চালানো হবে। কোনো পরীক্ষার্থী বা পরিদর্শক যদি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটান, তবে তাৎক্ষণিকভাবে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
বোর্ড থেকে প্রকাশিত নির্দেশনায়, কেন্দ্রের ভেতরে মোবাইল ফোন বা কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস প্রবেশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। শুধুমাত্র কেন্দ্র সচিব একটি সাধারণ (স্মার্টফোন নয়) ফোন ব্যবহার করতে পারবেন। এছাড়া, কেন্দ্রের ২০০ গজের মধ্যে অভিভাবক বা বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। প্রশ্নপত্র বহন ও বিতরণের ক্ষেত্রেও বিশেষ ‘লকিং সিস্টেম’ এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবহার করা হচ্ছে।
পরীক্ষার সার্বিক প্রস্তুতি এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, আমরা একটি প্রতিযোগিতামূলক এবং পরিচ্ছন্ন পরীক্ষা উপহার দিতে বদ্ধপরিকর। প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমাদের বিশেষ ভিজিল্যান্স টিম মাঠে কাজ করছে। নকল বা প্রশ্ন ফাঁসের যেকোনো অপচেষ্টা রুখতে আমরা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আছি। পরীক্ষার্থীদের জন্য আমাদের বার্তা স্পষ্ট—মেধার লড়াই হবে কেবল কলম আর মগজে, কোনো অনৈতিক উপায়ের স্থান এখানে নেই।
শিক্ষামন্ত্রীর ‘সারপ্রাইজ ভিজিট’ গুঞ্জন, অনিয়ম রোধে ফিরছে কি সেই ‘হেলিকপ্টার মিলন’ আতঙ্ক?
এবারের এসএসসি পরীক্ষা শুরুর আগেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সম্ভাব্য ‘সারপ্রাইজ ভিজিট’ বা ঝটিকা অভিযান। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নকল প্রতিরোধের ইতিহাসে তার নাম একটি বিশেষ আতঙ্কের ও আস্থার জায়গা দখল করে আছে। অতীতে প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হেলিকপ্টারে চড়ে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে নকলবাজ ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের হাতেনাতে ধরেছিলেন, যার ফলে জনমনে তিনি ‘হেলিকপ্টার মিলন’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পান।
এবারও পরীক্ষা শুরুর আগে বিভিন্ন মহলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে যে, পরীক্ষার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে শিক্ষামন্ত্রী যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো কেন্দ্রে ঝটিকা অভিযানে হাজির হতে পারেন। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কেন্দ্রগুলোতে, যেখানে অতীতে নকলের প্রবণতা বেশি ছিল, সেখানে এই ‘সারপ্রাইজ ভিজিট’ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সোমবার (২০ এপ্রিল) দুপুরে এসএসসি পরীক্ষার সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়ে সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, আমরা অবহিত আছি যে, এবারের এসএসসি ব্যাচ করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে প্রাথমিক ও জুনিয়র উভয় বৃত্তি পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ফলে এসএসসি পরীক্ষাই তাদের জীবনের প্রথম এবং পূর্ণ সিলেবাসের পাবলিক পরীক্ষা। এ কারণে পরীক্ষার হল যেন পরীক্ষার্থীবান্ধব থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারই এবারের প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করে গেছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রশ্নপত্রের কোনো অংশে দুর্বোধ্যতা থাকলে তা নিরসনে সহায়তা করা হবে। উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও অহেতুক কঠোরতা আমাদের লক্ষ্য নয়। কোনো পরীক্ষার্থী যেন তার প্রাপ্য মূল্যায়ন থেকে সামান্যতম বঞ্চিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পরীক্ষা ভীতি দূর করে আনন্দময় শিক্ষা নিশ্চিত করতে চায় সরকার : প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা উপদেষ্টা
শিক্ষার্থীদের মন থেকে পরীক্ষার আতঙ্ক দূর করে একটি ইতিবাচক ও আনন্দময় পরিবেশে এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা সম্পন্ন করতে চায় সরকার। সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত একই সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন এ প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
মাহদী আমিন বলেন, বর্তমান জনবান্ধব সরকার শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে মানসিক চাপ কমিয়ে ‘পরীক্ষা ভীতি’ শব্দটিকে চিরতরে বিদায় দিতে চায়। এবারের পরীক্ষার্থীরা করোনা পরিস্থিতির কারণে প্রাথমিক ও জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা দিতে পারেনি। ফলে এটিই তাদের জীবনের প্রথম পূর্ণ সিলেবাসের পাবলিক পরীক্ষা। তাই পরীক্ষার হল যেন কোনোভাবেই তাদের কাছে আতঙ্কের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকে আমাদের বিশেষ নজর রয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের সাহসী ভূমিকার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, এই কোমলমতি শিক্ষার্থীরা রাজপথে যে সৃজনশীলতা ও সাহসের পরিচয় দিয়েছে, তার প্রতিফলন তারা পরীক্ষার খাতায়ও দেখাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। এ সময় তিনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে শিক্ষার্থীদের প্রতি সর্বোচ্চ সহিষ্ণু আচরণের নির্দেশনা দেন।
একইসঙ্গে পরীক্ষার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কেন্দ্রে নিরাপদ খাবার পানি নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত আলো, ফ্যান এবং স্বাস্থ্যকর টয়লেটের ব্যবস্থা রাখা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য আইপিএস বা জেনারেটরের বিকল্প ব্যবস্থা রাখা এবং ছাত্রীদের যাতায়াত শতভাগ নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রাখতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিশেষ নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান।