বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Channel18

সারা দেশ

ধানে লাভ নেই, বছরের চাল যোগাতেই এখনও চাষে কৃষকেরা

ধানে লাভ নেই, বছরের চাল যোগাতেই এখনও চাষে কৃষকেরা

ধান কেটে ঘরে তুলেছেন ধামরাই উপজেলার মাদারপুর গ্রামের কৃষক আব্দুস সালাম। কিন্তু ফসল ঘরে ওঠার আনন্দের চেয়ে খরচের হিসাবই এখন বেশি ভাবাচ্ছে তাকে। প্রায় ২০ বছর ধরে ধান চাষ করা এই কৃষক বলছেন, এখন ধান চাষে লাভ বলতে তেমন কিছু নেই; বছরের খাবারের চালের নিশ্চয়তার জন্যই মূলত চাষ করে যাচ্ছেন তারা।

চলতি মৌসুমে ৯০ শতাংশ জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন আব্দুস সালাম। ধান কাটতে গত বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত তিন দিনে ২২ জন শ্রমিক লাগাতে হয়েছে। প্রতিদিন শ্রমিকপ্রতি মজুরি ছিল ১ হাজার ১০০ টাকা। শুধু ধান কাটতেই খরচ হয়েছে ২২ হাজার টাকা। এ ছাড়া ধান মাড়াইয়ে ২ হাজার ৭০০ টাকা, সেচ ও জমি প্রস্তুতে ১০ হাজার টাকা, সার কিনতে ১২ হাজার টাকা এবং চারা রোপণের সময় শ্রমিকের পেছনে আরও ৮ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। নিজের শ্রমের মূল্য ধরেননি তিনি। সব মিলিয়ে খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৫ হাজার টাকা।

আব্দুস সালাম জানান, ৯০ শতাংশ জমি থেকে প্রায় ৬০ মণ ধান পেয়েছেন। বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকায়। সেই হিসাবে মোট ধানের মূল্য প্রায় ৭০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে কিছু খড় পাওয়া যাবে। তবে তিন মাসের বেশি সময় ধরে চাষাবাদের পর লাভের পরিমাণ খুবই কম বলে মনে করছেন তিনি।

ধামরাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় গত সপ্তাহ থেকে ধান কাটা শুরু হয়েছে। তবে কয়েক দফা বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসে অনেক জায়গায় ধান কাটায় বিঘ্ন ঘটে। কোথাও জমিতে পানি জমে থাকায় হারভেস্টার নামানো যায়নি। ফলে শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে শ্রমিকের মজুরিও।

মাদারপুরে আব্দুস সালাম ১ হাজার ১০০ টাকায় শ্রমিক পেলেও অনেক কৃষককে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হয়েছে।

উপজেলার বড় নারায়ণপুর এলাকার কৃষক মো. হোসেন আলী ১৫ বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, “গত শনিবার ছয়জন শ্রমিক দিয়ে জমির একাংশের ধান কাটাতে হয়েছে। প্রতিজনকে ১৫০০ টাকা করে মজুরি দিতে হওয়ায় এক দিনেই খরচ হয়েছে ৯ হাজার টাকা।”

গাংগুটিয়া ইউনিয়নের বড়নালাই এলাকার কৃষক নবীন ব্যাপারী বলেন, “শ্রমিকের হাটে শ্রমিক নেই। যারা আছে তারাও অতিরিক্ত টাকা চাইছে। কোনো বেলায় শ্রমিকের বাজার ১২০০, আবার কোনো বেলায় ১৫০০। এক মণ ধানের চেয়েও শ্রমিকের দাম অনেক বেশি।”

কৃষকেরা বলছেন, উৎপাদন খরচ যেভাবে বেড়েছে, তাতে ধান চাষ আর আগের মতো লাভজনক নেই। আব্দুস সালাম বলেন, “এক সময় ধান চাষে লাভ থাকলেও বর্তমানে হিসাব অনেকটাই বরাবর। লাভের চেয়েও এখন তার ধান চাষের বড় কারণ বছরের পুরো ধান পাওয়া।”

রোয়াইল এলাকার কৃষক জসীম উদ্দিনও একই অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, “ধান চাষ করে এখন বছরের খাওয়ার যোগান আসে। কিন্তু লাভ হয় না। তাও জমি তো পতিত রাখা যাবে না। চাষ তো করতে হবে। তাই ধান করি।”

তার মতে, শ্রমিকসংকট কমানো এবং সারসহ কৃষি উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ধান চাষ কিছুটা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। না হলে অনেক কৃষকই ধান চাষ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন।

বাংলাদেশ কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য লাকী আক্তার বলেন, কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়লেও তারা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, “কৃষক, বর্গাচাষী ও কৃষি মজুরেরা প্রতিবছর ফসল উৎপাদন করলেও উৎপাদনের উপকরণের দাম ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। কিন্তু সেই তুলনায় কৃষক লাভজনক দাম তো দূরের কথা, ন্যায্যমূল্যও পাচ্ছেন না।”

তার ভাষ্য, “মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্যের কারণে কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। অন্যদিকে সরকার নির্ধারিত দামে অধিকাংশ কৃষক ফসল বিক্রি করতে পারেন না; নানা শর্তের বেড়াজালে পড়ে তারা ভুক্তভোগী হন।”

সরকারি উদ্যোগে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ফসল কেনা, জেলা পর্যায়ে সরকারি হিমাগার নির্মাণ এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।

লাকী আক্তার আরও বলেন, “কৃষিকে শুধু বাজারের হাতে ছেড়ে দিলে চলবে না; খাদ্য উৎপাদনকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে দেখতে হবে। কৃষিতে পর্যাপ্ত ভর্তুকি ও প্রণোদনা দিতে হবে এবং কৃষিনির্ভর শিল্প কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কারণ কৃষিই বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখবে।”

তিনি অভিযোগ করেন, “মার্কিন চুক্তি বাস্তবায়িত হলে দেশের কৃষি খাত আরও বিপর্যয়ে পরবে। তখন শর্তের বেড়াজালে আমেরিকার চাপে কৃষিতে ভর্তুকি কমিয়ে দেবে সরকার। তাতে কৃষকের অবস্থা আরও করুণ হবে।”

ধামরাই উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর উপজেলায় ১৭ হাজার ৩ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। গত বছর এ পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৯৯০ হেক্টর। চলতি মৌসুমে ৯৫ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

ধামরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান বলেন, “এখন একদিকে ধানের দাম বেশি পাওয়া যাচ্ছে। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে ছিল এবং একই সাথে উন্নত জাতের উচ্চ ফলনশীল ধান আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগে চাষাবাদ করায় ফলন বেশি হবে।”

তিনি জানান, “প্রতিটি ইউনিয়নে তিনটি মাঠে ৪০ বিঘা করে জমিতে খামারি অ্যাপের মাধ্যমে সুষম সার প্রয়োগ ও নিবিড় পরিচর্যা করেছে। পাশাপাশি পার্টনার প্রকল্পের এ ডব্লিউ ডি প্রযুক্তি ও ঢাকা অঞ্চল কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আধুনিক বীজ ও প্রযুক্তি সহায়তা কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে উৎপাদন বৃদ্ধিতে।”

কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, “কৃষি অফিস চাচ্ছে, ধান চাষে পরিশ্রম বেশি লাভ কম হলেও ধানের জমি অন্য ফসলে দখল না হোক। উল্লেখ্য যে, সরিষা কেটেই ঐ জমিতে বোরোধান আবাদ করে। ফলে সার কম লাগে। তাই কৃষক ধান উৎপাদনে আগ্রহী থাকেন।

আরও

তিন দশক ধরে কাগজে জমি, রানীর পাশে উপজেলা প্রশাসন

সারা দেশ

তিন দশক ধরে কাগজে জমি, রানীর পাশে উপজেলা প্রশাসন

পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের অমর কবিতা ‘আসমানী’র সেই বঞ্চিত জীবনের গল্প যেন বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছে ঢাকার ধামরাইয়ে। তবে এবার ফ...

২০২৬-০৯-০১ ২২:২৪

রামগড়ে বিএনপি'র ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

সারা দেশ

রামগড়ে বিএনপি'র ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি'র ৪৭ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে র‍্যালী, কেক কাটা ও আলো...

২০২৬-০৯-০১ ২২:২৩

কাঁচপুরে এসিল্যান্ড ফাইরুজের মোবাইল কোর্ট, এক মাসে ১২ লক্ষাধিক টাকা জরিমানা

সারা দেশ

কাঁচপুরে এসিল্যান্ড ফাইরুজের মোবাইল কোর্ট, এক মাসে ১২ লক্ষাধিক টাকা জরিমানা

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে কাঁচপুর রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফাইরুজ তাসনিমের নেতৃত্বে...

২০২৬-০৯-০১ ১৯:৪৬

মীরসরাইয়ে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত

সারা দেশ

মীরসরাইয়ে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত

চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে র‌্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়...

২০২৬-০৯-০১ ১৮:৫৯