আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে এই প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা, অর্থ ও বাণিজ্য সচিব এবং এনবিআর চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টরা অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন মিললে প্রস্তাবটি আগামী জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
যেসব পণ্যে বাড়তে পারে কর
এনবিআরের প্রস্তাবিত তালিকায় রয়েছে ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, ছোলা, মসুর ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, লবণ, আদা, হলুদ, শুকনা মরিচ, আটা, ময়দা, ফলমূলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য। এছাড়া সরিষা, তিল, কাঁচা চা-পাতা, পাটজাত পণ্য ও বীজও এই কর বৃদ্ধির আওতায় আসতে পারে।
কেন বাড়ানো হচ্ছে উৎসে কর
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য আরও বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু অর্থনৈতিক মন্দা, আমদানি কমে যাওয়া এবং সীমিত করজালের কারণে প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ দিয়েই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে সরকার।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরবরাহ পর্যায়ে কর আদায় কঠোরভাবে নিশ্চিত করা গেলে বছরে ৫০০ কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত রাজস্ব পাওয়া সম্ভব।
কী এই উৎসে কর
বর্তমান ব্যবস্থায় কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সরবরাহকারীর কাছ থেকে পণ্য কিনলে বিল পরিশোধের সময় নির্ধারিত হারে কর কেটে রাখে এবং পরে তা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়। একইভাবে এলসির মাধ্যমে আমদানি হলে ব্যাংক সরাসরি ওই কর কেটে এনবিআরে জমা দেয়।
খাদ্য ও পানীয় খাতের বড় প্রতিষ্ঠান, সুপারশপ, ওষুধ শিল্প, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং বৃহৎ করপোরেট ক্রেতারা এই ব্যবস্থার আওতায় পড়ে।
বাড়তে পারে বাজারদর
ব্যবসায়ী ও বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, উৎসে কর বাড়ানো হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাজারদরের ওপর। কারণ ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত করকে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করেন।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, “এনবিআরের কাছে একবার টাকা গেলে বাস্তবে সেটা ফেরত পাওয়া কঠিন। তাই ব্যবসায়ীরা করকে খরচ হিসেবেই ধরে নেয়। এতে পণ্যের দাম বাড়বে।”
তার মতে, বর্তমানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনও ১০ শতাংশের আশপাশে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করের চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
নীতিগত প্রশ্নও উঠছে
বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক বছর আগেও নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যকে উৎসে করমুক্ত রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলেন বর্তমান এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান। কিন্তু এখন রাজস্ব ঘাটতির চাপে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে উল্টো কর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এনবিআরের সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগেও কয়েক দফায় এই কর কমানো হয়েছিল। এখন আবার বাড়ানো হলে নীতিগত ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
আরও যেসব খাতে বাড়তে পারে কর
বাজেট সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শুধু নিত্যপণ্য নয়, আরও কয়েকটি খাতে কর বাড়ানোর চিন্তা চলছে। এর মধ্যে রয়েছে:
রফতানি প্রণোদনায় উৎসে কর ১০% থেকে ২০% করা
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন ‘প্যাকেজ ভ্যাট’
ব্যাংক হিসাব খুলতে BIN বাধ্যতামূলক করা
কোমল পানীয়, ফলের রস, আইসক্রিম ও প্রসাধনীতে ভ্যাট বৃদ্ধি
ব্যাটারিচালিত রিকশা ও মোটরসাইকেল নিবন্ধনে অগ্রিম আয়কর
ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচে নতুন কর
রাজস্ব নাকি ভোক্তা স্বস্তি?
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। তবে নিত্যপণ্যে উৎসে কর বাড়ানো হলে এই দুই লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী অবস্থায় চলে যেতে পারে।
কারণ সরবরাহ পর্যায়ে কর বাড়লে শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে বাজারে। আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি যখন এখনও উচ্চ পর্যায়ে, তখন নতুন করের চাপ সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।