বুধবার (২৭ মে) সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর গাবতলী গবাদি পশুর হাটের সীমানা পেরিয়ে গাবতলী মাছের আড়তের সীমানাও অতিক্রম করেছে কোরবানির পশুর হাট। সীমানার মধ্যে শামিয়ানা টাঙানো থাকলেও খোলা আকাশের নিচেই হাজার হাজার গরু বাঁধা রয়েছে। উপরে নামমাত্র পলিথিন বা ত্রিপল টাঙানো হয়েছে। তবে বৃষ্টি এলেই শেষ রক্ষা হচ্ছে না। অতিরিক্ত বৃষ্টি হলেই গরু, বিক্রেতা ও ক্রেতাকে ভিজতে হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে নিচেও কাদা-পানিতে কর্দমাক্ত পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
রাজধানীর গাবতলী গবাদি পশুর হাটে সকাল ৯টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, গাবতলী মহাসড়ক থেকে শুরু করে বসিলা সড়কে ট্রাক ও মিনি ট্রাকের জট। প্রতিটি ট্রাকেই শত শত গরু। কয়েক ঘণ্টায়ও গাড়ি সরছে না বলে জানিয়েছেন ট্রাকচালকরা। তারা জানান, গরু কোথায় নামাবেন, সেটার জন্য জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। সে কারণে গাড়ি এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে।
ট্রাকচালক ও গরু ব্যবসায়ীরা জানান, ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোর গরু আজ গাবতলীতে আনা হচ্ছে। গতকাল বিকেল থেকেই আশপাশের জেলার গরু বেশি এসেছে। মানিকগঞ্জ, নবাবগঞ্জ, দোহার, গাজীপুর, সাভার, কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত ট্রাক ও মিনি পিকআপে করে ভোরে হাটে গরু আনা হচ্ছে।
আরো দেখা যায়, হাটের নির্ধারিত সীমানা অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে। হাটের ভেতরে জায়গা না পেয়ে আশপাশের সড়ক, খোলা স্থান এবং প্রবেশপথজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে পশুবাহী ট্রাক ও মিনি পিকআপ। অনেক ব্যবসায়ী এখনো গরু ট্রাকেই রেখে দিয়েছেন। কোথাও কোথাও ট্রাকের ওপরই গরুকে খাওয়ানো ও দেখাশোনা করতে দেখা গেছে। শত শত গরু দীর্ঘ সময় ধরে গাড়িতে থাকায় পশুগুলোও ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়তে দেখা যায়।
হাটে সকাল থেকে টানা বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। হাটের অধিকাংশ জায়গায় কাদা ও পানি জমে কর্দমাক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও পা ফেলার মতো অবস্থাও নেই। কাদার কারণে গরু নামানো, বেঁধে রাখা এবং ক্রেতাদের পশু দেখানো অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়েছে। অনেক গরু বৃষ্টিতে ভিজে একেবারে কাদামাখা অবস্থায় দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরাও ভেজা কাপড়েই ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাটে অবস্থান করছেন।
মানিকগঞ্জ থেকে ১২টি গরু নিয়ে এসেছেন ইকবাল হাসান। তিনি জানান, বৃষ্টির কারণে স্বাভাবিক বেচাকেনা ব্যাহত হচ্ছে। ক্রেতাদের উপস্থিতিও তুলনামূলক কম। বিকেলে বৃষ্টি না থাকলে ক্রেতা আসবে। আজই শেষ দিন, আমরাও গরু বিক্রি শেষ করতে চাই।
এই ব্যবসায়ী আরও বলেন, গতকাল রাতে এসেছি। ২টা বিক্রি করেছি। সকালে বৃষ্টি না হলে আরও বিক্রি করতে পারতাম। এখনো সব বিক্রি করতে পারিনি। বৃষ্টির কারণে ক্রেতা কম, আবার কাদার জন্য গরু দেখাতেও সমস্যা হচ্ছে।
আবুল মিয়া নামে এক বিক্রেতা বলেন, হাটে এত গরু এসেছে যে জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। ট্রাকেই গরু রাখতে হচ্ছে। বৃষ্টিতে গরু ভিজছে, আমরাও কষ্ট করছি।
নারায়ণগঞ্জ থেকে ছয়টি গরু নিয়ে গাবতলী পশুর হাটে এসেছেন আজাদ ব্যাপারী। তবে হাটে পৌঁছেও স্বস্তি নেই তার। গাবতলীর প্রবেশমুখে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে মিনি পিকআপ নিয়ে অপেক্ষা করছেন তিনি। হাটে গরু রাখার জন্য আগে থেকে নির্ধারিত কোনো জায়গা না থাকায় ভেতরে প্রবেশ করেও জায়গা পাচ্ছেন না। চারদিকে ট্রাক, পিকআপ আর গরুর ভিড়ে কার্যত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এতে গরু নামানো তো দূরের কথা, গাড়ি সরানোও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।
একই ধরনের ভোগান্তিতে পড়েছেন নবাবগঞ্জ থেকে আসা সাইদুর রহমানও। ১৭টি গরু নিয়ে ট্রাকে করেই এখনো অবস্থান করছেন তিনি। হাটের ভেতরে জায়গা সংকটের কারণে গরু নামাতে পারছেন না। দীর্ঘ সময় ধরে ট্রাকে আটকে থাকায় গরুগুলোও অস্বস্তিতে পড়েছে। তিনি বলেন, হাটে পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা ও নির্ধারিত জায়গার অভাবে ঈদের আগে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।
অন্যদিকে, ক্রেতারাও ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন। কাদা মাড়িয়ে এক হাট থেকে আরেক হাটে যেতে কষ্ট হচ্ছে বলে জানান তারা। অনেকেই বলেন, হাটে চলাচলের পরিবেশ আরও উন্নত করা প্রয়োজন ছিল। ঈদের আগমুহূর্তে অতিরিক্ত গরুর চাপ এবং বৃষ্টি ও কাদার কারণে গাবতলী গবাদি পশুর হাট এখন দুর্ভোগের এক বড় চিত্রে পরিণত হয়েছে বলে জানান ক্রেতা ও বিক্রেতারা।