বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় কৃষকদের দাবি, মরা খালগুলো খনন করা হলে বরগুনায় এক ফসলি জমি পরিণত হবে তিন ফসলি জমিতে। বিশেষ করে বৃষ্টি হলেই ফসলের মাঠে জলাবদ্ধতা কমবে, আবার শুকনো মৌসুমে প্রয়োজনীয় পানি উত্তোলনও করা যাবে। এতে একদিকে কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং ব্যয় কমবে, অপরদিকে কৃষকদের অর্থিক সচ্ছলতাও ফিরবে। আর এ কারণে দ্রুত সময়ের মধ্যে বরগুনার সব মরা খাল খননের দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বরগুনার বিভিন্ন এলাকায় এখন পর্যন্ত মোট ৬০৯টি খালের অস্তিত্ব সনাক্ত করা হয়েছে। যা খনন ও পুনর্খননের প্রয়োজন। সনাক্ত এসব খালের দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ৬৭ কিলোমিটার। তবে খালগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত বরগুনা সদর, বামনা, বেতাগী ও পাথরঘাটা উপজেলায় ১৫৯টির খালের মোট ৪০০ কিলোমিটার খননের জন্য একটি প্রকল্পে অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া, অপর আরেকটি প্রকল্পে তালতলী উপজেলায় মোট ৪০টি খালের জন্য ১২৫ কিলোমিটার খননের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। তবে বর্তমানে বড় কোনো প্রকল্প না থাকলেও রাজস্ব বাজেট থেকে বরগুনার বিভিন্ন এলাকায় ২৯ কিলোমিটার দৈর্ঘের ৯টি খাল খনন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার খাল খনন কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
সরেজমিনে বরগুনা সদর উপজেলার ৮নং সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ ক্রোক নামক এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দীর্ঘবছর ধরে খনন না করায় পলিমাটি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়া ক্রোক খাল নামক একটি খালের পুনর্খনন কাজ চলছে। গত ২২ মার্চ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলাম মণি এ খালটির পুনর্খনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। বর্তমানে খনন কাজ প্রায় শেষের দিকে। তবে এখন পর্যন্ত খালটির যেসব অংশের খনন শেষ হয়েছে, সেখানে ফিরতে শুরু করেছে পানির প্রবাহ। ফলে আশপাশের কৃষি জমিতে ওই খাল থেকেই প্রয়োজনীয় পানি সেচ করতে পারছেন কৃষকরা। আবার বৃষ্টি হলে পানি জমে জলাবদ্ধতা হওয়ারও কোনো শঙ্কা নেই তাদের। এ ছাড়া, নিত্য প্রয়োজনীয় কাজে খালের পানি ব্যবহার করতে পারছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আগে যে জমি বছরে একবার চাষাবাদ করা যেতো সেই একই জমিতে এখন দুই থেকে তিনবার চাষাবাদ করা যাবে বলেও জানিয়েছেন কৃষকরা।
ক্রোক খালটি খননের বিষয়ে ওই এলকার বাসিন্দা মো. নুর-ই আলম বলেন, এই খালটি কচুরিপানা জমে মাটি পড়ে একদম ভরাট হয়ে গিয়েছিল। পানি আটকে থাকতো। বৃষ্টি হলেই খেতে পানি জমে থাকায় ফসল নষ্ট হয়ে যেতো। দুই থেকে তিনবার ধানের বীজতলা তৈরি করা লাগতো। এখন খালটি খনন করা হচ্ছে, আমাদের কৃষি কাজে এ খালটি খুবই উপকারে আসবে।
একই এলাকার বাসিন্দা মো. মোস্তফা নামে আরেক কৃষক বলেন, এই খালটি যখন শুকনো ছিল পানির অভাবে ফসল নষ্ট হয়ে যেতো। আমরা পানি জমলে তা নামাতে পারতাম না। আবার প্রয়োজনের সময় পানি না থাকায় উঠাতেও পারতাম না। এখন খাল খনন চলছে পানি চলমান থাকবে, আমাদের কৃষি কাজে উপকার হবে।
ইসহাক হাওলাদার নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, আগে পানি জমে থাকতো এখন পানি জমবে না। আবার জখন পানির প্রয়োজন হবে তখন খাল থেকে আমরা পানি উঠাতে পারবো। বৃষ্টিতে পানি জমলে আমরা আগে বীজতলা করতে পারিনি, এখন খাল সচল থাকলে বৃষ্টি হলেও আর পানি জমে থাকবে না। আমাদের বীজতলা করতে কোনো সমস্যা হবে না।
ক্রোক এলকার স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম মো. আনিসুর রহমান বলেন, আমাদের এই খালটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। খাল দিয়ে পানি চলাচল না করায় কৃষিকাজে সমস্যা হতো। এখন খনন কাজ সম্পন্ন হলে পানি চলাচল করতে পারবে এবং কৃষি কাজে সুবিধা হবে। আগে এ এলাকর মানুষ একবার ফসল ফলাতে পারতো, এখন দুই থেকে তিনবার ফসল ফলাতে পারবে। এ ছাড়া, পুকুর কম থাকায় মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় কাজেও এ খালের পানি ব্যবহার করতে পারবে।
বরগুনায় কৃষকদের আর্থিক সচ্ছলতা এবং জীবনমানের উন্নয়নে খাল খনন গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে জানিয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস ঢাকা পোস্টকে বলেন, বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর মধ্যে খাল খনন অন্যতম। আমাদের বরগুনায়ও খাল খননের কাজ চলমান রয়েছে। খাল খনন প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বরগুনায় কৃষি কাজে উল্লেখযোগ্য একটি পরিবর্তন ঘটবে। যেখানে আগে কৃষকরা একটি ফসল ফলাতে পারতো সেখানে অধিক ফসল ফলাতে পারবে। পাশাপাশি আগে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো, খাল খনন বাস্তবায়ন হলে তা আর থাকবে না। এর ফলে কৃষকরা বেশি ফসল উৎপাদন করতে পারবে এবং আর্থিক লাভসহ জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে।
বরগুনার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল হান্নান প্রধান বলেন, সমুদ্র নিকটবর্তী জেলা বরগুনায় অসংখ্য নদী-নালা এবং খাল রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৬০৯টি খালের অস্তিত্ব আমরা পেয়েছি। খালগুলো দীর্ঘদিন ধরে খনন না করায় পলিমাটি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। কিছুকিছু জায়গায় দখল-দূষণে অস্তিত্ব বিলিন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বরগুনায় ক্রমান্বয়ে খালগুলো খননের পরিকল্পনা নিয়েছি। ইতোমধ্যেই আমাদের দপ্তর থেকে একটি প্রকল্প পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে দাখিল করেছি। যেখানে আমরা ১৫৯টি খালে প্রায় চারশো কিলোমিটার খননের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া, তালতলী উপজেলায় আরেকটি প্রকল্পের মাধ্যমে ৪০টি খালের ১২৫ কিলোমিটার পুনর্খননের জন্য প্রস্তাব করেছি। বর্তমানে আমাদের ৯টি খালের ২৯ কিলোমিটার খনন কাজ চলমান। এর মধ্যে প্রায় ১৬ কিলোমিটার খনন কাজ শেষ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, উপকূলীয় জেলা বরগুনায় মিষ্টি পানির সংকট। বিশেষ করে কৃষকদের তরমুজ এবং ধান চাষের জন্য মিষ্টি পানির প্রয়োজন। আমরা আশাকরি, বরগুনার খালগুলো যদি খনন করতে পারি এবং বর্ষার সময়ে পানি ধরে রাখতে পারি তাহলে এ এলাকার মানুষের জীবন জীবিকার একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। মৎস্য সম্পদের ভান্ডার হিসাবে পরিচিত বরগুনায় মাছের উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে।