যদি প্রশ্ন করা হয়—ইতালি না কানাডা? যেকোনো ফুটবলপ্রেমীর উত্তর হয়তো একটাই হবে, ইতালি জাতীয় ফুটবল দল। ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিশ্বকাপ—সবকিছু মিলিয়ে আজ্জুরিদের মোহই আলাদা। ক্রিস্তান্তের গল্পও ঠিক সেখান থেকেই শুরু। জন্ম ইতালিতে, বেড়ে ওঠা ইতালির ফুটবল সংস্কৃতির ভেতর। কিন্তু রক্তের ভেতরে ছিল কানাডার সংযোগ—বাবার সূত্রে তার হাতে ছিল কানাডার দরজাও। দুটি পথ খোলা ছিল সামনে। একটিতে নিশ্চিত সুযোগ, অন্যটিতে স্বপ্নের লড়াই। তিনি বেছে নিলেন স্বপ্নটাই, ইতালির হয়ে খেলবেন।
শৈশবের ছোট্ট মাঠ থেকে শুরু করে বড় ক্লাবের একাডেমি; ধীরে ধীরে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন ক্রিস্তান্তে। ইতালির সান ভিতো তাগলিয়ামেন্তোয় জন্ম ক্রিস্তান্তের। কানাডিয়ান বংশোদ্ভূত বাবা ও ইতালিয়ান বংশোদ্ভূত মা বড় সাধ করে ব্রিটিশ গায়ক ব্রায়ান ফেরির নামে ছেলের নাম রেখেছিলেন ব্রায়ান। সান জিওভান্নি দ্য কাসারসার মাঠ থেকে ফুটবলার হয়ে ওঠার স্বপ্নের শুরু। এরপর অপেশাদার দল লিভেন্তিনা গরগেনস হয়ে এসি মিলানের বয়সভিত্তিক দল। ২০০৯ সালে মিলানের একাডেমিতে ঢোকার পরের বছরই ডাক পান ইতালি অনূর্ধ্ব–১৬ দলে। ধাপে ধাপে অনূর্ধ্ব–২১ পর্যন্ত খেলেন। সেই পথে এএস রোমাতেও পাকা হয় জায়গা। ক্রিস্তান্তে কানাডা নাকি ইতালির হয়ে খেলবেন, সেই আলোচনাটা ভালোভাবে শুরু হয় ২০১৭ সালে।
বড় সুযোগটা চলে আসে ২০১৮ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে। ড্যানিয়েল ডি রসি, মার্কো ভেরাত্তি ও লরেঞ্জো পেলেগ্রিনি চোটে পড়ায় ২০১৭ সালের অক্টোবরে মেসিডোনিয়া ও আলবেনিয়ার বিপক্ষে বাছাইপর্বের ম্যাচে ইতালি দলে প্রথমবার ডাক পান। ৬ অক্টোবর মেসিডোনিয়ার বিপক্ষে বদলি নেমে অভিষেকও হয়ে যায় এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের। প্রতিভা নজরে পড়ে, পথ খুলে যায় বড় মঞ্চের দিকে। জাতীয় দলের বয়সভিত্তিক ধাপ পেরিয়ে অবশেষে ২০১৭ সালে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত ডাক—ইতালির সিনিয়র দলে। সেই সময়ই কানাডা থেকেও ডাকা হচ্ছিল তাকে। কোচ চেয়েছিলেন, সহজ পথ বেছে নিক তিনি। সেখানে জায়গা পাওয়া সহজ, ভবিষ্যৎও তুলনামূলক নিশ্চিত। কিন্তু ক্রিস্তান্তে অন্যরকম। জীবনকে তিনি বলেছিলেন, “প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করব।”
কিন্তু ফুটবল সবসময় গল্পের মতো চলে না। সময় পেরিয়ে গেছে। ম্যাচ এসেছে, ম্যাচ গেছে। জাতীয় দলের হয়ে ৪৭টি ম্যাচও খেলেছেন তিনি। কিন্তু সবচেয়ে বড় মঞ্চ, বিশ্বকাপ—সেখানে জায়গা হয়নি। বসনিয়ার কাছে হেরে ইতালি বাদ পড়ল বিশ্বকাপ থেকে। সেই সঙ্গে ক্রিস্তান্তের স্বপ্নটাও যেন দূরের কোনো স্বপ্নই থেকে গেছে। অথচ অন্য পথটা নিলে গল্পটা ভিন্ন হতে পারত। কানাডার হয়ে খেললে ২০২২ বিশ্বকাপে মাঠে নামার সুযোগ ছিল। আর ২০২৬ বিশ্বকাপে স্বাগতিক হিসেবে তাদের নিশ্চিত অংশগ্রহণ। অর্থাৎ, হয়তো দুটি বিশ্বকাপ খেলেই ফেলতে পারতেন। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন ইতালিকে। একটি ভালোবাসা, একটি বিশ্বাস—যার মূল্য কখনো কখনো খুব বেশি হয়।
এখন সময়ের দিকে তাকালে প্রশ্ন জাগে—আর কতটা সুযোগ আছে? পরবর্তী বিশ্বকাপ আসতে আসতে বয়স হবে ৩৫। তখন এই জায়গায় থাকা কি সম্ভব? উত্তরটা অনিশ্চিত। ফুটবল কখনো নিশ্চয়তার খেলা নয়। সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্যটা হয়তো এখনও সামনে—২০২৬ বিশ্বকাপে বসনিয়া খেলবে কানাডার বিপক্ষে। এক ম্যাচ, যেখানে ক্রিস্তান্তে একসঙ্গে দেখতে পারতেন নিজের দুই শিকড়—একটি জার্সিতে, আরেকটি প্রতিপক্ষে। কিন্তু সেই গল্প আর লেখা হলো না। শেষ পর্যন্ত, এই গল্পটা শুধু একটি মিস করা পেনাল্টির নয়। এটা এক সিদ্ধান্তের গল্প। এক ভালোবাসার গল্প। একটি স্বপ্নের, যা বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে গিয়ে থেমে গেছে।
আর সেই প্রশ্ন, “যদি…” এই এক শব্দটাই হয়তো সারাজীবন তাড়া করে ফিরবে ক্রিস্তান্তেকে। কারণ ফুটবল কখনো কখনো শুধু খেলা নয়—এটা এমন এক আয়না, যেখানে নিজের সিদ্ধান্তের প্রতিচ্ছবিই সবচেয়ে নির্মম হয়ে ফিরে আসে।