মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ডিপ্লোমেটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত ‘ডিক্যাব টক’ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, শান্তিপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বহুপক্ষীয়তা ও সহযোগিতার মতো অভিন্ন মূল্যবোধের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিকে আগের তুলনায় বেশি ‘বিশৃঙ্খল, বিপজ্জনক ও অনিশ্চিত’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত অনেক ক্ষেত্রে যোগাযোগের একটি সাধারণ উপায়ে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে সংকুচিত হচ্ছে সহযোগিতার পরিসর।
বিশ্ব গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, যুদ্ধ ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে বলপ্রয়োগের প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এ অবস্থায় সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন তিনি।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে ফ্রান্সের অবস্থান
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে সহসভাপতিত্বে দ্বিরাষ্ট্র সমাধান নিয়ে আয়োজিত একটি যৌথ সম্মেলনের প্রেক্ষাপটে ফ্রান্স এ সিদ্ধান্ত নেয়। যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও বেলজিয়ামসহ কয়েকটি পশ্চিমা দেশের একই ধরনের উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিপ্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করা, ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি ফ্রান্সের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা।
ইন্দো-প্যাসিফিকে ভারসাম্যের নীতি
বাংলাদেশকে ফ্রান্সের ‘দীর্ঘদিনের, নির্ভরযোগ্য ও অনুমানযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করেন জিন-মার্ক সেরে-চারলেট।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ফ্রান্সের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ফ্রান্স বহুপাক্ষিক ‘তৃতীয় পথ’ বা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানকে গুরুত্ব দেয়।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে সহায়তা করাকে ফরাসি নীতির অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, এতে কোনো দেশকে ওয়াশিংটন বা বেইজিংয়ের মধ্যে একটি পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য হতে হবে না।
ভারত মহাসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নৌ চলাচলের স্বাধীনতার ওপরও গুরুত্ব দেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত। অবৈধ মাছ ধরা, জলদস্যুতা ও পাচারের মতো অপ্রথাগত নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা জানান তিনি।
সাড়ে চার বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়েছে বাণিজ্য
বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গতিশীল হলেও বাণিজ্যে কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা রয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত।
তিনি বলেন, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সাড়ে চার বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়েছে। ফরাসি রপ্তানির তুলনায় বাংলাদেশি পণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ফ্রান্সের বাংলাদেশ থেকে মোট আমদানির প্রায় ৯৫ শতাংশই টেক্সটাইল, বিশেষ করে পোশাক ও পরিধেয় পণ্য থেকে আসে বলেও জানান তিনি।
বিমান চলাচল, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতেও দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। পরিবহন, জ্বালানি ও টেকসই নগর উন্নয়নে ফরাসি শিল্পগোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ভবিষ্যতে ফার্মাসিউটিক্যালস, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বৈচিত্র্যময় করার সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন রাষ্ট্রদূত।
জলবায়ু ও উন্নয়ন সহযোগিতা
জলবায়ু কূটনীতিতে ফ্রান্সের ভূমিকার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত বলেন, ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তির অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে ফ্রান্স পরিবেশগত সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের সঙ্গে অভিযোজন, টেকসই অবকাঠামো ও দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা আরও জোরদারের কথা জানান তিনি।
ফরাসি উন্নয়ন সংস্থার তহবিলের ৮০ শতাংশের বেশি জলবায়ু সহনশীলতা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত বলেও জানান রাষ্ট্রদূত। বাংলাদেশে টেকসই অবকাঠামো ও সবুজ অভিযোজন উদ্যোগে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্তরণ এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়াতেও ফ্রান্স সহযোগিতা করছে বলে জানান তিনি।
নারীর অধিকার ও জেন্ডার সমতার ক্ষেত্রেও ফ্রান্সের ‘নারীবাদী পররাষ্ট্রনীতি’র কথা তুলে ধরেন জিন-মার্ক সেরে-চারলেট। শিক্ষা, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও প্রজনন অধিকারকে এ নীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
সবশেষে বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্ক আরও গভীর করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই দেশের অভিন্ন মূল্যবোধ ও শান্তিপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পক্ষে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। ফ্রান্স বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আরও জোরদার করতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।