বাজেটের ভেতরের আসল চিত্র, প্রাপ্তির আশা আর সংকটের শঙ্কা নিয়ে এই বিশেষ প্রতিবেদন।
এবারের বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো এর বিশাল আকার। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের চাহিদা মেটাতে প্রতিবছরের মতো এবারও রেকর্ড অঙ্কের বাজেট পেশ করা হয়েছে। তবে বাজেটের আকার যত বড় হয়েছে, ঠিক ততটাই চওড়া হয়েছে রাজস্ব ঘাটতির খতিয়ান।
বিশাল এই ব্যয়ের বিপরীতে অভ্যন্তরীণ খাত (যেমন: এনবিআর) থেকে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় নিয়ে বরাবরের মতোই বড় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। ফলে আয়ের সাথে ব্যয়ের বিশাল ফারাক বা ঘাটতি রয়েই গেছে, যা মেটাতে সরকারকে বড় অঙ্কের ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বাজেটের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং উদ্বেগের জায়গা হলো অভ্যন্তরীণ ঘাটতি মেটানোর উৎস। এবারও বাজেট ঘাটতির একটা সিংহভাগ অর্থ ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিয়ে পূরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার যদি নিজেই ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা ধার করে নেয়, তবে দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে তীব্র তরলতার সংকট দেখা দিতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের বেসরকারি খাতের ওপর। সাধারণ ব্যবসায়ী ও নতুন উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় ঋণ পাবেন না। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে গেলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হওয়া থমকে যাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে ঋণ নেয়ার প্রবণতা বাড়লে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি বা পণ্যের দাম আরও আকাশচুম্বী হতে পারে।
সব শঙ্কার মাঝেও এই বাজেটকে ঘিরে কিছু ইতিবাচক স্বপ্ন দেখছে সরকার। বাজেটে বেশ কিছু জায়গায় স্বস্তির বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। চলমান বড় বড় মেগা প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে গতি আনবে। দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও ভাতার পরিমাণ কিছুটা বাড়ানো হয়েছে, যা প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে কর রেয়াত ও শুল্ক সহায়তার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এবারের বাজেট কেবল ‘কাগজে-কলমে’ পাস করার চেয়ে ‘বাস্তবায়ন’ করাটা অনেক বেশি কঠিন হবে। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা, ডলার সংকট এবং দেশের ভেতরের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের পিঠ এমনিতেই দেয়ালে ঠেকে আছে।
এই পরিস্থিতিতে বাজেট সফল করতে হলে সরকারকে তিনটি জায়গায় কঠোর হতে হবে। করের আওতা বাড়িয়ে কর ফাঁকি বন্ধ করতে হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) নামে অনুৎপাদনশীল খাতে সরকারি অর্থের অপচয় পুরোপুরি বন্ধ করা জরুরি। ব্যাংক খাতের ওপর চাপ কমিয়ে বৈদেশিক সহজ শর্তের ঋণ বা অনুদান পাওয়ার চেষ্টা বাড়াতে হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেট একদিকে যেমন সমৃদ্ধ আগামীর ‘আশা’ দেখায়, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের ওপর অতি-নির্ভরশীলতার কারণে সামষ্টিক অর্থনীতিতে গভীর ‘শঙ্কা’ও জিইয়ে রাখে। শেষ পর্যন্ত সরকারের সুশাসন আর দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপরই নির্ভর করছে এই বাজেট দেশের জন্য আশীর্বাদ হবে নাকি সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়াবে।