পুলিশের ব্যারিকেড, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মীর মোতায়েন এবং ছয়টি মেট্রো স্টেশনে গণপরিবহন চলাচল বন্ধের মধ্যেও সাধারণ ভারতীয়রা এগিয়ে গেছেন তাদের প্রজাতন্ত্রের প্রাণভোমরা, ভোট দেওয়ার অধিকার রক্ষায়।
সোমবারের এই মিছিল কেবল রাজনৈতিক বিক্ষোভ ছিল না; এটি ছিল ভারতীয় গণতন্ত্রের এক জোরালো বিজয়। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে, সাংবিধানিক অধিকারগুলোর মৌলিক কাঠামো যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখনও জনগণের চেতনা দমে যায় না।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কলাম, টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন জনসমাবেশে আমি একটি কঠিন বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছি। তা হলো, বর্তমানে ১৩ কোটির বেশি ভারতীয় নাগরিককে তাদের ভোটাধিকার ও পছন্দের রাজনৈতিক প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। সামনে আরও ভোটার বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
১৩ কোটি মানুষ মানে জাপান, জার্মানি বা যুক্তরাজ্যের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়াকে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিছক প্রশাসনিক ত্রুটি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্বের জন্যই সংকট।
ভোটাধিকার হলো সেই মৌলিক সেতুবন্ধন, যা একজন সাধারণ নাগরিককে রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করে। যখন ১৩ কোটিরও বেশি নাগরিকের জন্য সেই সেতুটি ভেঙে দেওয়া হয়, তখন জনগণের সার্বভৌমত্বই চুরমার হয়ে যায়।
একটি বিষয় আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই: ভোটার তালিকা থেকে ভুয়া, মৃত কিংবা প্রকৃতপক্ষে অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম বাদ দিয়ে তালিকা সংশোধনের বিরুদ্ধে আমি নই।
সঠিক ভোটার তালিকা নিশ্চিত করা সুশাসনের মৌলিক শর্ত। তবে আমাদের বিচারব্যবস্থায় যেমন ‘দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ’ নীতি প্রযোজ্য, ভোটাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেও একই মৌলিক আইনি ও সাংবিধানিক নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
কোনো নাগরিককে একতরফাভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে পরে যোগ্যতা প্রমাণের দায় তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না; বরং ব্যবস্থা হওয়া উচিত উল্টো। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কোনো নাগরিক ভোট দেওয়ার অযোগ্য, এটি প্রমাণের দায় রাষ্ট্রের ওপরই থাকতে হবে। তার আগে কোনো নাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া উচিত নয়।
বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত ভারতের নির্বাচনী গণতন্ত্র কীভাবে এমন বিপজ্জনক অবস্থার মুখে এসে দাঁড়াল?
এই সংকটের পেছনে রয়েছে তড়িঘড়ি করে সংশোধিত নিয়ম কার্যকর করা; ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’ শনাক্তে একটি অদ্ভুত অ্যালগরিদমের ব্যবহার, যেখানে আগের দাপ্তরিক বা টাইপের ভুলও হিসাবের মধ্যে রাখা হয়নি।
এর সঙ্গে ২০০২ সালের ভোটার তালিকাকে চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে বেছে নেওয়া, ফর্ম ৬-এ বেআইনি পরিবর্তন, ফর্ম ৭-এর ব্যাপক ব্যবহার এবং স্বচ্ছতাহীন, কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত নতুন সফটওয়্যার ব্যবস্থা যুক্ত হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
আইন অনুযায়ী, স্থানীয় পর্যায়ের ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসাররা (ইআরও) ভোটার হওয়ার যোগ্যতা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কে সরাসরি ধারণা থাকায় ইআরওদের যথাযথ যাচাই-বাছাই করার ক্ষমতা ছিল। তারা ভোটারের বসবাসের ঠিকানা যাচাই করতেন এবং কোনো বৈধ ভোটার যাতে অন্যায়ভাবে ভোটাধিকার হারিয়ে না ফেলেন, তা নিশ্চিত করতেন।
কিন্তু এই বিকেন্দ্রীভূত সুরক্ষা ব্যবস্থা অ্যালগরিদম ও কেন্দ্রীয় নির্দেশনার মাধ্যমে পাশ কাটানো হয়েছে। ফলে ইআরওদের ক্ষমতাও কার্যত কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের গোয়া-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে। সেখানে দেখা গেছে, কোনো নাগরিকের ভোটাধিকার থাকবে কি না, এমন সিদ্ধান্ত এখন কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত সফটওয়্যার দিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ের যাচাই, ইআরওর মতামত কিংবা ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক নীতির কোনো সুযোগ থাকছে না।
নতুন নিয়ম ও পদ্ধতি রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অ্যাক্টের মূল চেতনার পরিপন্থী। কারণ এতে ব্যক্তি পর্যায়ে যথাযথ নোটিশ দেওয়া বা মাঠপর্যায়ে যাচাই ছাড়াই ব্যাপকসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই অন্যায্য কার্যক্রম অবিলম্বে স্থগিত করা উচিত।
শুধু নির্দিষ্ট সময় পরপর নির্বাচন আয়োজন করলেই একটি শক্তিশালী গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না। এর মূল শক্তি নির্ভর করে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও সবার জন্য সহজলভ্য একটি নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগে যেসব ৭০ হাজার ভোটার বাদ পড়ার বিরুদ্ধে আপিল করেছিলেন, তাদের মধ্যে ৯১ শতাংশের নামই ভুলভাবে বাদ দেওয়া হয়েছিল বলে শুনানিতে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু আরও কয়েক লাখ ভোটারের আপিলের সময়মতো শুনানি হয়নি। ফলে তারা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
এই পরিস্থিতি এখন অস্তিত্বের সংকটে রূপ নিয়েছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া যখন প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং সাংবিধানিক অধিকারের চেয়ে প্রশাসনিক সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তখন গণতান্ত্রিক কাঠামোই ভেঙে পড়ে।
রাষ্ট্র যখন পরিকল্পিতভাবে ভোটার তালিকা থেকে মানুষের নাম বাদ দেয় এবং একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার জনগণের অধিকারও খর্ব করে, তখন নাগরিকদের সম্মিলিত মতপ্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোও বন্ধ হয়ে যায়।
তাই এমন একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা রক্ষায় আমাদের দৃঢ় থাকতে হবে, যেখানে প্রত্যেক যোগ্য নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত থাকবে এবং নির্বাচন কমিশনের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো শাসকগোষ্ঠীর হাতিয়ার না হয়ে জনগণের নিরপেক্ষ অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।
বিরোধী দলগুলোর এই আন্দোলন স্পষ্টতা, দ্রুত পদক্ষেপ এবং সাংবিধানিক নীতির প্রতি অটল থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
ভোটাধিকার থেকে আরও মানুষকে বঞ্চিত করা ঠেকাতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) অবিলম্বে স্থগিত করতে হবে। সংশোধিত ফর্ম ৬ ও ৭-এর অধীনে চালু করা অযৌক্তিক ও আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ নিয়ম ও পদ্ধতি বাতিল করতে হবে।
একই সঙ্গে সফটওয়্যার ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে ইআরওদের ভোটার হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণে তাদের আইনগত ও যথাযথ কর্তৃত্ব ফিরিয়ে দিতে হবে। ভোটাধিকার হারানো প্রত্যেক নাগরিকের নাম আবার ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে স্বচ্ছ নিরীক্ষাও চালাতে হবে।
ইসিকে আবারও এই মৌলিক গণতান্ত্রিক নীতি নিশ্চিত করতে হবে যে, একজন নাগরিক ভোটার হওয়ার যোগ্য—এটাই ধরে নিতে হবে। কারও নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হলে তার যৌক্তিকতা প্রমাণের দায় কর্তৃপক্ষের ওপরই থাকতে হবে। নাগরিকদের বারবার তাদের নাগরিকত্ব ও বসবাসের প্রমাণ দিতে বাধ্য করা যাবে না।
এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের উচিত পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যালোচনা করা। তবে শুধু প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনলেই হবে না; প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থাও ফিরিয়ে আনতে হবে।
নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকতে হয়। কিন্তু বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) ওপর প্রধান বিরোধী দলগুলোর আস্থা কার্যত নষ্ট হয়ে গেছে। এসআইআর পরিচালনায় অব্যবস্থাপনার দায় নিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে তাঁর পদত্যাগ করা উচিত।
রাজনৈতিক অঙ্গনের বড় অংশের আস্থা হারানো কোনো সিইসি বিশ্বের বৃহত্তম নির্বাচনী ব্যবস্থা পরিচালনার দায়িত্ব বিশ্বাসযোগ্যভাবে পালন করতে পারেন না।
একবার যাচাই করা, সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ভোটার তালিকা তৈরি হলে এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া যে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয়েছে, তা নিশ্চিত করা গেলে সব দলই নির্বাচনের ফল মেনে নেবে। সোমবারের মিছিল প্রমাণ করেছে, দেশের মানুষের বিবেক এখনও জাগ্রত।
সোমবার রাজধানীর রাজপথে হাজারো মানুষ সংবিধানের কপি হাতে নিয়ে নিজেদের মৌলিক অধিকারের দাবিতে যে মিছিল করেছেন, এর মধ্য দিয়ে তারা দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—সরকারের আদেশে গণতন্ত্র কাউকে উপহার দেওয়া হয় না; গণতন্ত্র জনগণের অধিকার।
এই অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সাংবিধানিক অধিকার আদায়ের শান্তিপূর্ণ সংগ্রাম চলবে।
শশী থারুর ভারতের কেরালার তিরুঅনন্তপুরম থেকে চারবার নির্বাচিত কংগ্রেস সংসদ সদস্য
দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া