খসড়া বিধিমালায় বলা হয়েছে, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতির জন্য যোগ্য হওয়ার পরও পদোন্নতি নিতে না চাইলে সেটিকে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন বিধিমালাটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়ার পর এটি চূড়ান্ত করা হবে।
পদোন্নতিতে এসিআরের নম্বর গুরুত্বপূর্ণ
খসড়া বিধিমালায় বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন বা এসিআরের নম্বরের জন্যও নির্দিষ্ট মানদণ্ড রাখা হয়েছে।
পদোন্নতির জন্য আগের পাঁচ বছর অথবা ফিডার পদে চাকরিকালের মধ্যে যেটি কম, সেই সময়ের এসিআরের গড় নম্বর কমপক্ষে ৮০ হতে হবে।
গড় নম্বর ৬৯-এর নিচে হলে সেটিকে বিরূপ মন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এ ছাড়া অবসরোত্তর ছুটি বা পিআরএলে থাকা কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতি পাবেন না।
কোন পদে পদোন্নতি দেওয়া যাবে
খসড়া অনুযায়ী, পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত শূন্য পদের বিপরীতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি দেওয়া যাবে।
তবে কোনো কর্মকর্তা লিয়েন বা চলতি দায়িত্বে থাকার কারণে যে পদটি খালি হয়েছে, সেই পদে পদোন্নতি দেওয়া যাবে না।
কীভাবে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ হবে
খসড়া বিধিমালায় নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের নিয়মও বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে।
উন্মুক্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যিনি আগে নিয়োগ পেয়েছেন, তিনি পরে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তির চেয়ে জ্যেষ্ঠ হবেন।
একই সময়ে একাধিক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হলে কমিটি বা কমিশনের তৈরি মেধাতালিকা অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হবে।
মেধাতালিকা না থাকলে বয়সের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হবে। বয়সও একই হলে শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের শিক্ষাবর্ষ এবং এরপর ফলাফল বিবেচনা করা হবে।
পদোন্নতির ক্ষেত্রে ফিডার পদে নিয়মিত যোগদানের তারিখকেও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের ভিত্তি ধরা হবে।
মামলা থাকলে পদোন্নতি আটকে যাবে
কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় অভিযোগনামা দাখিল, দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় চার্জশিট, ফৌজদারি মামলা করার সরকারি অনুমোদন বা গ্রেপ্তারের ঘটনা থাকলে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি দেওয়া হবে না।
এ ছাড়া কোনো কর্মকর্তা লঘুদণ্ড পেলে দণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরও দুই বছর পর্যন্ত পদোন্নতি পাবেন না। গুরুদণ্ডের ক্ষেত্রেও দণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দুই বছর পদোন্নতি বন্ধ থাকবে।
তবে বিভাগীয় মামলা, দুদকের মামলা বা ফৌজদারি অভিযোগ থেকে কেউ অব্যাহতি পেলে এবং পদ শূন্য থাকলে তাঁকে পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ থাকবে। এ ক্ষেত্রে তিনি ধারণাগত জ্যেষ্ঠতাও পেতে পারেন।
পদোন্নতির ক্ষেত্রে কমিটি বা কমিশনের সুপারিশ
খসড়া অনুযায়ী, উচ্চতর স্কেলে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কমিটি বা কমিশনের সুপারিশ প্রয়োজন হবে।
বিভাগীয় পদোন্নতি নির্ধারিত কোটার মধ্যেই রাখতে হবে। কোটার বাইরে অতিরিক্ত পদোন্নতি দেওয়া হলে সেই পদোন্নতির তারিখ থেকে জ্যেষ্ঠতা গণনা করা যাবে না।
একই ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একসঙ্গে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করা হলে তাঁদের পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা বয়সের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে।
পদোন্নতি নিতে না চাইলে শাস্তির সুযোগ
খসড়া বিধিমালার সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাবগুলোর একটি হলো—যোগ্য হওয়ার পরও কেউ পদোন্নতি নিতে না চাইলে সেটিকে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করা।
সরকারি চাকরি আইনে অসদাচরণের জন্য বিভিন্ন ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে। এর মধ্যে তিরস্কার, পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা এবং নিম্ন ধাপে নামিয়ে দেওয়ার মতো লঘুদণ্ড রয়েছে।
গুরুদণ্ডের মধ্যে রয়েছে নিম্নপদ বা নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমিত করা, বাধ্যতামূলক অবসর এবং চাকরি থেকে অপসারণ।
কেন এমন বিধান আনা হচ্ছে
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি নিয়ে নতুন বিধিমালা তৈরির কাজ চলছে। খসড়াটি নিয়ে বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হচ্ছে।
নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের একটি অংশ, বিশেষ করে ঢাকায় কর্মরত কিছু কর্মকর্তা, সহকারী সচিব পদে পদোন্নতি নিতে অনাগ্রহী—এমন বিষয়ও খসড়ায় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পদোন্নতি নিলে ঢাকার বাইরে বদলি হওয়ার আশঙ্কায় অনেকে বর্তমান পদে থাকতে চান বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।
তবে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, যথাযথভাবে বিধিমালা তৈরি না হলে ভবিষ্যতে মামলা-মোকদ্দমা ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে সরকারি চাকরিতে নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতা এবং পদোন্নতি না নেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়মে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এখনো এটি খসড়া পর্যায়ে রয়েছে।