এই দীর্ঘ সময়ে কেউ পেয়েছে চিকিৎসা, কেউ পড়াশোনার সুযোগ, কেউ মাদকমুক্ত হওয়ার চেষ্টা, কেউ পেয়েছে কর্মসংস্থানের পথ। আবার কয়েকটি মেয়েশিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে যৌন শোষণ ও পতিতাবৃত্তির ঝুঁকি থেকে। তবে সব গল্পের শেষটা সুখের হয়নি। নিজের চোখের সামনে কিছু শিশুকে ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়তেও দেখেছেন ওমর ফারুক। তাই তার কাছে এই ১২ বছরের পথচলা একই সঙ্গে অর্জন ও আক্ষেপের।
সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করার পেছনে নিজের মায়ের ভূমিকার কথা বারবার বললেন ওমর ফারুক হিরু। তিনি বললেন, ‘ছোটবেলা থেকেই এসব শিশুর প্রতি মায়ের মানবিক আচরণ আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। পরে পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের সহযোগিতা নিয়েই পথশিশুদের জন্য কাজ শুরু করি।’
কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ২০২০ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নেয় ‘নতুন জীবন’। তার আগে ২০১৮ সালে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কল্যাণে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সংগঠনটি অর্জন করে ‘ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’। তবে নিয়মিত কোনো প্রতিষ্ঠান বা উৎস থেকে অর্থসহায়তা না পাওয়ায় সংগঠনের অধিকাংশ কার্যক্রম এখনো চলে নিজেদের অর্থায়নে। মাঝেমধ্যে মানবিক মানুষজন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
ওমর ফারুকের কাজের দর্শন ধীরে ধীরে বদলেছে। শুরুতে ছিল খাবার ও জরুরি সহায়তা। পরে তিনি বুঝেছেন, শুধু একবেলা খাবার দিয়ে একটি শিশুকে রাস্তা থেকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে আনা যায় না। তাই ‘নতুন জীবন’ এখন শিক্ষা, চিকিৎসা, মাদকমুক্তকরণ, পুনর্বাসন, কারিগরি দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রতি শুক্রবার কক্সবাজার শহরের পৌর প্রিপারেটরি উচ্চ বিদ্যালয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয়। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি শালীনতা, দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও আত্মনির্ভরশীলতার বিষয়েও ধারণা দেওয়া হয়। খেলাধুলা ও শরীরচর্চার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার সুযোগও রাখা হয়েছে।
জরুরি মুহূর্তে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়াতে ‘নতুন জীবন’-এর রয়েছে কুইক রেসপন্স টিম বা কিউআরটি। স্বেচ্ছাসেবক মিনহাজ চৌধুরী জানালেন, কোনো শিশু অসুস্থ বা আহত হলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। দুর্যোগের সময় বিপদগ্রস্ত শিশুদের সহায়তা, জরুরি খাদ্য দেওয়া এবং নির্যাতনের শিকার শিশুদের উদ্ধারের কাজও করে এই দল। কক্সবাজারে চিকিৎসা সম্ভব না হলে প্রয়োজন অনুযায়ী চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকার হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ওমর ফারুকের দীর্ঘ পথচলায় কিছু শিশুর জীবন বদলের গল্প তাকে এখনো অনুপ্রাণিত করে। আসমা নামের এক শিশু একসময় রাস্তায় থাকত। পরে নতুন জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়াশোনা ও বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। একপর্যায়ে জেলা প্রশাসন আয়োজিত একটি শিশু চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। ওমর ফারুকের কাছে আসমার এই সাফল্য শুধু একটি পুরস্কার নয়, এটি সুযোগ পেলে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরাও নিজেদের প্রতিভা বিকশিত করতে পারে তার একটি উদাহরণ।
ওমর ফারুক বললেন, ‘১৩টি মেয়ের অভিভাবক আমি। যারা একসময় পথশিশু হিসেবে এখানে ছিল। বর্তমানে তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের বিয়ে হয়েছে এবং তারা স্বাভাবিক ও আলোকিত জীবন পেয়েছে। অনেকেই এখন ভালো আছে। এটাই আমাদের কাজের বড় সাফল্য।’
পথশিশু মেয়েদের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন ওমর ফারুক ও তার সহকর্মীরা। কারণ তারা যৌন হয়রানির শিকার হতে পারে, পড়তে পারে পতিতাবৃত্তির ফাঁদে। স্বেচ্ছাসেবক নূপুর বলছিলেন, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে এখন পর্যন্ত ৮ মেয়েশিশুকে এমন ঝুঁকি থেকে উদ্ধার করে সমন্বিত শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে হস্তান্তর করা হয়েছে।
পথশিশুদের আরেকটি বড় ঝুঁকি মাদক। ‘নতুন জীবন’-এর দাবি, শতাধিক পথশিশুকে মাদকের আসক্তি থেকে মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাদকাসক্ত শিশুদের পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য নিরাময়কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। খাইরুল আমিন, সাইফুল ও রনির মতো শিশুদের ‘নোঙর’সহ বিভিন্ন সহায়তার মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে জানান ওমর ফারুক।
কিন্তু সব শিশুর গল্প এমন নয়। ওমর ফারুক বললেন, ‘কষ্টের জায়গা হলো, নিজের চোখের সামনে অনেককে ছিনতাইকারী হতে দেখেছি। সেটার জন্য আমরা সবাই দায়ী।’
ওমর ফারুকের অভিজ্ঞতায়, পথশিশু ছেলেরা কোনো না কোনোভাবে জীবিকার পথ খুঁজে নেয়। কেউ রিকশা চালায়, কেউ ভ্যান চালায়, কেউ অন্য কাজ করে। কিন্তু কাজের সুযোগ না পাওয়া, যথাযথ দিকনির্দেশনার অভাব ও অভিভাবকত্বের সংকটে অনেকেই ছিনতাইসহ অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
এই বাস্তবতা থেকেই শিশুদের কর্মদক্ষতা তৈরির দিকে জোর দিয়েছে ‘নতুন জীবন’। সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ২০ জনের বেশি শিশুর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ওমর ফারুকের লক্ষ্য, সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা যেন বড় হয়ে অন্যের সহানুভূতির ওপর নির্ভরশীল না থাকে। শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করা।