প্রথমবার সঞ্চয়পত্র কেনার পরিকল্পনা থাকলে তাই নিচের পাঁচটি বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখুন।
১. জরুরি প্রয়োজনে টাকার ব্যবস্থা থাকবে তো?
সঞ্চয়পত্রে টাকা রাখার আগে নিজের জরুরি তহবিলের বিষয়টি নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা, পরিবারের হঠাৎ প্রয়োজন, চাকরি বা ব্যবসায় সাময়িক সমস্যা যে কোনো কারণে অল্প সময়ের মধ্যে টাকার দরকার হতে পারে।
কিন্তু সঞ্চয়পত্র মূলত নির্দিষ্ট মেয়াদের বিনিয়োগ। সেই সময় শেষ হওয়ার আগেই ভাঙাতে হলে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী মুনাফার পরিমাণ কমে যেতে পারে। ফলে যে টাকার খুব দ্রুত প্রয়োজন হতে পারে, তা পুরোপুরি সঞ্চয়পত্রে আটকে রাখা ঠিক নয়।
তাই বিনিয়োগের আগে কয়েক মাসের প্রয়োজন মেটানোর মতো কিছু নগদ অর্থ বা সহজে তোলা যায় এমন সঞ্চয় আলাদা রাখুন। এরপর অবশিষ্ট টাকা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে দেওয়ার কথা ভাবুন।
২. বিনিয়োগের পুরো টাকা এক জায়গায় রাখবেন না
সঞ্চয়পত্রে বেশি টাকা বিনিয়োগ করার আগে মুনাফার স্তর ও প্রযোজ্য সীমা সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। নির্দিষ্ট সীমার ওপরে বিনিয়োগ করলে মুনাফার হার পরিবর্তিত হতে পারে। তাই শুধু ‘বেশি টাকা রাখলে বেশি লাভ’ এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ সাড়ে সাত লাখ টাকার বেশি হলে মুনাফার হার ধাপে ধাপে কমে যায়। তাই বিনিয়োগের টাকার পরিমাণ বেশি হলে এক নামে না রেখে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।
পরিবারের আর্থিক পরিকল্পনার সঙ্গে মিলিয়ে একাধিক খাতে টাকা ভাগ করে বিনিয়োগ করা তুলনামূলকভাবে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হতে পারে। তবে পরিবারের অন্য সদস্যের নামে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয়, মালিকানা, কর ও প্রযোজ্য আইনকানুন অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু কর বাঁচানোর উদ্দেশ্যে অন্যের নামে টাকা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
৩. কর ও টিআইএনের নিয়ম আগে জেনে নিন
সঞ্চয়পত্র থেকে পাওয়া মুনাফার সঙ্গে করের বিষয়টিও জড়িত। অনেকেই সঞ্চয়পত্র কেনার সময় শুধু ঘোষিত মুনাফার হার দেখেন। কিন্তু উৎসে কর কেটে নেওয়ার পর হাতে আসা প্রকৃত অর্থ কত, সেটি হিসাব করেন না।
আপনার ক্ষেত্রে কত শতাংশ উৎসে কর প্রযোজ্য হবে, টিআইএন বা আয়কর রিটার্নের কী প্রয়োজন রয়েছে এসব বিষয় আগে জেনে নেওয়া ভালো। কারণ কাগজপত্র বা করসংক্রান্ত নিয়ম ঠিকমতো না বুঝে বিনিয়োগ করলে পরে মুনাফার হিসাব নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। সঞ্চয়পত্র কেনার আগে নিজের কর-সংক্রান্ত অবস্থার সঙ্গে প্রযোজ্য নিয়ম মিলিয়ে নেওয়াই নিরাপদ।
৪. নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী স্কিম বেছে নিন
সব সঞ্চয়পত্রের সুবিধা এক রকম নয়। কারো নিয়মিত মাসিক আয় প্রয়োজন হতে পারে, আবার কেউ নির্দিষ্ট সময় পর একসঙ্গে টাকা পাওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন। তাই পরিচিত কেউ কোন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেছেন বা কোন স্কিমে মুনাফার হার বেশি শুধু সেটি দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না। আগে ঠিক করুন, আপনার মুনাফা কখন প্রয়োজন। মাসিক খরচ চালানোর জন্য নিয়মিত অর্থ দরকার হলে এক ধরনের স্কিম উপযোগী হতে পারে। আবার দীর্ঘমেয়াদে টাকা রেখে নির্দিষ্ট সময় পর অর্থ পাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে অন্য ধরনের সঞ্চয়পত্র বেশি সুবিধাজনক হতে পারে।
৫. সব সঞ্চিত অর্থ শুধু সঞ্চয়পত্রে রাখবেন না
সঞ্চয়পত্র তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে জনপ্রিয় হলেও ভবিষ্যতের সব অর্থ একটি মাত্র জায়গায় রাখা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ জীবনের বিভিন্ন সময়ে টাকার প্রয়োজন এবং আর্থিক লক্ষ্য আলাদা হয়।
আপনার সঞ্চয়কে প্রয়োজন অনুযায়ী স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি এই তিন ভাগে পরিকল্পনা করা যেতে পারে। জরুরি প্রয়োজনের অর্থ সহজে ব্যবহারযোগ্য জায়গায় রাখা, মাঝারি মেয়াদের অর্থ অন্য বিনিয়োগে রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের জন্য সঞ্চয়পত্র বিবেচনা করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিনিয়োগের আগে শুধু মুনাফার হার নয়, টাকা কতদিন আটকে থাকবে, প্রয়োজনের সময় কতটা সহজে পাওয়া যাবে এবং কর কাটার পর প্রকৃত লাভ কত হবে এসব হিসাব করা। প্রথমবার সঞ্চয়পত্র কিনতে গেলে তাই তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে নিজের আর্থিক প্রয়োজন, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নিয়ম ভালোভাবে বুঝে বিনিয়োগ করুন। তাহলেই সঞ্চয়পত্র আপনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার কার্যকর অংশ হতে পারে।