৩০ জুন স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে মেয়র গ্রেগোয়ারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ফরিদ আহাম্মদ রনি। সাক্ষাৎকালে প্যারিসকে কেন্দ্র করে নির্মিত তাঁর আলোকচিত্রভিত্তিক প্রকাশনা, নগর-ঐতিহ্য সংরক্ষণে শিল্পের ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক যোগাযোগে বইটির গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হয়। মেয়র ভবিষ্যতে তাঁর কাজকে বিশেষভাবে সম্মানিত করার আগ্রহও প্রকাশ করেন বলে জানা গেছে।
একজন বাংলাদেশি আলোকচিত্রী হিসেবে প্যারিস সিটি প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এমন স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। এর আগে প্যারিসের সাবেক মেয়র আন্নে ইদালগোর হাতেও তিনি একই গ্রন্থ তুলে দিয়েছিলেন। ফলে ধারাবাহিকভাবে প্যারিসের দুই মেয়রের কাছেই বইটির পৌঁছে যাওয়া বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনা ও আলোকচর্চার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার নতুন দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
তবে ‘প্যারিসের ছবি’র আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল আরও আগেই। ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর প্যারিস পিস ফোরামে আইফেল টাওয়ারের সামনে ‘ম্যুজে দ্য মারিন’-এ ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর হাতে বইটি তুলে দেন ফরিদ আহাম্মদ রনি। হাসিমুখে বইটি গ্রহণ করেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। পরে বইটি পৌঁছে যায় এলিসি প্রাসাদেও। প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে প্রাপ্ত প্রশংসাপত্র বইটির আন্তর্জাতিক মর্যাদাকে আরও সুদৃঢ় করে।
এর পাশাপাশি ফ্রান্সের ঐতিহাসিক গ্রঁ পালে আয়োজিত আন্তর্জাতিক ChangeNOW Summit-এ মোনাকোর যুবরাজ প্রিন্স আলবার্ট দ্বিতীয়, ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লরাঁ ফাবিউস এবং জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মেলিসা ফ্লেমিংয়ের হাতেও বইটি তুলে দেন তিনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি বইটির শিল্পগুণ, নান্দনিকতা এবং সাংস্কৃতিক মূল্যায়নের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
‘প্যারিসের ছবি’ কেবল একটি ফটোবুক নয়; এটি বাংলাদেশের প্রকাশনা ইতিহাসেও একটি মাইলফলক। কারণ এটিই প্রথম পূর্ণাঙ্গ আলোকচিত্রভিত্তিক গ্রন্থ, যা বাংলা, ইংরেজি ও ফরাসি—এই তিন ভাষায় একযোগে প্রকাশিত হয়েছে।
ফ্রান্সকে বলা হয় শিল্প, সাহিত্য ও কবিতার দেশ। সেই ঐতিহ্যকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে ধারণ করেছেন ফরিদ আহাম্মদ রনি। আইফেল টাওয়ারের আলোকচ্ছটা, লুভর জাদুঘরের মহিমা, ঐতিহাসিক স্থাপত্য, রাস্তার শিল্প, ভাস্কর্য, নগরজীবনের বৈচিত্র্য ও প্যারিসের সাংস্কৃতিক আত্মাকে ক্যামেরায় বন্দি করেছেন তিনি এক অনন্য শিল্পভাষায়। প্রতিটি ছবি যেন একটি জানালা, যার ভেতর দিয়ে দেখা যায় প্যারিসের ইতিহাস, সৌন্দর্য ও মানবিক আবহ।
দীর্ঘ গবেষণা, পরিকল্পনা ও সৃজনশীল শ্রমের সমন্বয়ে নির্মিত এই প্রকল্পে ফ্রান্স ও বাংলাদেশের গবেষক, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিকর্মী এবং শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দেশ-বিদেশের শিল্পবোদ্ধা ও আলোকচিত্র সমালোচকদের মতে, এটি শুধু একটি শহরভিত্তিক আলোকচিত্র সংকলন নয়; বরং বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের এক অনন্য দলিল।
ফরিদ আহাম্মদ রনির বিশ্বাস, আলোকচিত্র কেবল সৌন্দর্য ধারণের মাধ্যম নয়; এটি ইতিহাস সংরক্ষণ, সংস্কৃতি তুলে ধরা এবং মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরিরও শক্তিশালী ভাষা। তাঁর ‘প্যারিসের ছবি’ সেই বিশ্বাসেরই বাস্তব প্রতিফলন—যা বাংলাদেশের সৃজনশীলতার পরিচয় বহন করে আজ পৌঁছে গেছে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের এলিসি প্রাসাদ থেকে প্যারিস সিটি হল পর্যন্ত।