তবে আল-জাজিরার সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ বলছে, এক দশকের এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি উল্টো ফল বয়ে এনেছে, যেখানে পাকিস্তান সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন না হয়ে নতুন নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্লেষণটি বলছে, ভারতের এই কৌশল শেষ পর্যন্ত “বুমেরাং” হয়েছে।
ভারত শুরু থেকেই চেষ্টা করেছে আন্তর্জাতিক ফোরামে পাকিস্তানকে কোণঠাসা করতে। জাতিসংঘ, জি-টোয়েন্টি, সার্কসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়। বিশেষ করে সার্ক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে, কারণ ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা কমিয়ে দেয়। ২০১৬ সালের পর ভারত ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত সার্ক সম্মেলন বর্জন করলে সংগঠনটির কার্যক্রম আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
দিল্লির কৌশলের মূল তিনটি দিক ছিল, প্রথমত, পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা; দ্বিতীয়ত, বড় শক্তিগুলোর কাছে পাকিস্তানের গ্রহণযোগ্যতা কমানো; এবং তৃতীয়ত, আঞ্চলিক কূটনৈতিক কাঠামোয় ভারতের প্রভাব বৃদ্ধি করা। শুরুতে এই কৌশল অনেকটাই কার্যকর মনে হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়।
আল-জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় কারণ হলো চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধি। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (CPEC) প্রকল্প পাকিস্তানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিনিয়োগের পথ খুলে দেয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামো, শক্তি খাত এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় পাকিস্তান উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সহযোগিতা পায়। ফলে ইসলামাবাদের জন্য চীনের সমর্থন একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও পাকিস্তানকে পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারেনি। আফগানিস্তান পরিস্থিতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার কারণে ওয়াশিংটনকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়েছে। আল-জাজিরার বিশ্লেষণ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল সবসময় ভারসাম্যপূর্ণ ছিল, ভারতকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হলেও পাকিস্তানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা হয়নি।
এই অবস্থার মধ্যে পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতারের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজার-ভিত্তিক সম্পর্ক পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত থাকায় এই সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
আল-জাজিরা বলছে, এই তিনটি বড় আন্তর্জাতিক সংযোগ, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্য, পাকিস্তানকে একটি “পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র” হওয়া থেকে রক্ষা করেছে। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশটি নতুন কূটনৈতিক স্পেস তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
ভারতের কৌশল ব্যর্থ হওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তন। আজকের বিশ্ব আর এককেন্দ্রিক নয়; বরং এটি বহুকেন্দ্রিক বা মাল্টিপোলার হয়ে উঠছে। ফলে কোনো একটি দেশের পক্ষে অন্য দেশকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এখন স্বার্থনির্ভর, যেখানে বিভিন্ন দেশ একাধিক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, ভারত পাকিস্তানকে একঘরে করতে গিয়ে আঞ্চলিক কূটনীতিতে কিছুটা একক অবস্থানে চলে যায়, যা শেষ পর্যন্ত ভারতের নিজের কূটনৈতিক নমনীয়তা কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ায় ভারতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়।
কাশ্মীর ইস্যু, সীমান্ত উত্তেজনা এবং একাধিক সামরিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলা এবং পরবর্তী বালাকোট বিমান হামলার পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও তলানিতে পৌঁছে যায়। তবে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো এই পরিস্থিতিতে সরাসরি কোনো পক্ষ না নিয়ে বরং সংযম ও আলোচনার আহ্বান জানায়।
আল-জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়, ভারত পাকিস্তানকে “ডিপ্লোম্যাটিক আইসোলেশন” বা কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতায় ফেলতে চাইলেও বাস্তবে তা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। কারণ পাকিস্তান কেবল প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কৌশল নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নতুন জোট তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান যদিও অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তবে আন্তর্জাতিক পরিসরে তাদের গুরুত্ব একেবারে কমে যায়নি। বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আফগানিস্তান পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্য সংযোগের কারণে তাদের কূটনৈতিক অবস্থান এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, ভারতের নীতি অনেক ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াশীল ছিল, যা দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক বার্তা তৈরির দিকে বেশি ঝুঁকেছিল। এতে বিশ্ব কূটনীতিতে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী হলেও পাকিস্তানকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্ব রাজনীতিতে এখন “চয়েস বেসড অ্যালায়েন্স” বা সুবিধাভিত্তিক জোট বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দেশগুলো একক ব্লকে না থেকে একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে। এই বাস্তবতায় কোনো দেশকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা কার্যত প্রায় অসম্ভব।
আল-জাজিরা আরও বলছে, ভারতের কৌশল পাকিস্তানকে দুর্বল করার বদলে তাকে নতুন কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে সাহায্য করেছে। চীন, তুরস্ক, সৌদি আরব এবং কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পাকিস্তানকে একটি বহুমাত্রিক কূটনৈতিক অবস্থানে নিয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশই নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে, তবে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য তাদের কৌশলকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে সংঘাত নয়, বরং সংলাপ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর। কারণ কোনো একক দেশের পক্ষে অন্য দেশকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখা এখন আর সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে আল-জাজিরার বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দেয়, মোদির পাকিস্তান-বিরোধী কূটনৈতিক নীতি শুরুতে শক্তিশালী মনে হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বাস্তবতার মুখে পড়ে দুর্বল হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তিত কাঠামোতে পাকিস্তান বরং নতুন কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যা ভারতের “আইসোলেশন পলিসি”-কে কার্যত ব্যর্থ করে দিয়েছে।