কীভাবে তারা সোস্যাল মিডিয়ায় কাজ করে তা বেশির ভাগ লোকেরই অজানা। ক্ষতিকর এই বট বাহিনীকে মোকাবিলা করা বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অনেকেই হয়তো মনে করেন অর্থনৈতিক সমস্যা কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির টানাপোড়েন দেশের সব চেয়ে বড় সংকট।
কিন্তু এই দৃশ্যমান সংকটের আড়ালে আমাদের অলক্ষ্যেই দানা বাঁধছে এক নতুন এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক হুমকি। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে আমরা এই আপদের মুখোমুখি হচ্ছি।
এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, এমনকি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকেও করে তুলছে বিষাক্ত। অথচ একে আমরা নিয়তি বলে মেনে নিচ্ছি, কোনো স্থায়ী সমাধান খুঁজছি না। এই অদৃশ্য শত্রু আর কেউ নয়—সোশ্যাল মিডিয়ার বটবাহিনী।
গত এক দশকে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতার কারণে বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। কিন্তু এই ডিজিটাল জগৎ এখন আর কেবলই মুক্ত মতপ্রকাশ বা যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, কৃত্রিম জনমত তৈরি, বাণিজ্যিক আধিপত্য এবং পরিকল্পিত চরিত্রহননের এক নোংরা কুরুক্ষেত্রে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ একটি উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছেন।
তিনি জানান, দেশের সাইবার জগতের মোট ট্রাফিকের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই মূলত বট বা কৃত্রিম কার্যকলাপ! তিনি সতর্ক করে বলেন, এই নির্মম বাস্তবতা না বুঝে সাইবার বুলিং বা অনলাইনের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ঝুঁকি থাকে। কারণ, ফেসবুক বা অন্য মাধ্যমে আমরা যে বিপুল মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া ও ইন্টারঅ্যাকশন দেখি, তার বড় অংশই প্রকৃত মানুষের (অর্গানিক) নয়।
ভয়াবহতার চিত্র: এই বটবাহিনী এখন এতটাই শক্তিশালী ও সুসংগঠিত যে, তারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিশানা করে সাইবার আক্রমণ চালাচ্ছে। সরকারের ভালো ও জনকল্যাণমুখী সিদ্ধান্তগুলোর বিরুদ্ধে মুহূর্তের মধ্যে ভুয়া নেতিবাচক জনমত গড়ে তুলছে।
সমাজের স্বনামধন্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে তাদের ভাবমূর্তি ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, নারীদের অবমাননা ও হেনস্তা করে তাদের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে এই চক্র।
এরা সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে এমন এক ‘বায়বীয় অনুগত বাহিনী’ তৈরি করেছে, যার সদস্যরা কোনো মানুষ নয়, বরং রোবট।
বট আসলে কী এবং এরা কীভাবে কাজ করে তা জানা দরকার। ‘বট’ শব্দটি এসেছে মূলত ‘রোবট’ থেকে। এটি এমন এক ধরনের সফটওয়্যার প্রোগ্রাম বা অ্যালগরিদম, যা ইন্টারনেটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের মতো আচরণ করতে পারে। যখন কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে বা এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কয়েক হাজার বা লাখ লাখ ভুয়া প্রোফাইলকে একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়, তখন তাকে বলা হয় ‘বট আর্মি’ বা বটবাহিনী। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে টার্গেট করে গালি দেওয়া, প্রোপাগান্ডা ছড়ানো কিংবা কৃত্রিমভাবে কারও প্রশংসা করাই এদের কাজ।
ডিজিটাল জগতের এই অপশক্তি মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। এর একটি হলো অটোমেটেড বা স্বয়ংক্রিয় বট। অপরটি হলো হিউম্যান ট্রল আর্মি।
অটোমেটেড বা স্বয়ংক্রিয় বট সম্পূর্ণ কম্পিউটার প্রোগ্রাম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। নির্দিষ্ট কিছু ‘কি-ওয়ার্ড’ (Keyword) নির্ধারণ করে দিলে এরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। যেমন, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দেশের নাম লিখে পোস্ট করার সাথে সাথেই এই বটগুলো সেখানে গিয়ে আগে থেকে সেট করা কমেন্ট পেস্ট করে দেয়। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) যুক্ত বটগুলো আরও বিপজ্জনক। এরা শুধু কপি-পেস্ট করে না, বরং মানুষের মতোই প্রাসঙ্গিক ও ভিন্ন ভিন্ন মন্তব্য তৈরি করতে সক্ষম।
হিউম্যান ট্রল আর্মি: এরা সরাসরি রক্তমাংসের মানুষ, তবে কাজ করে ভুয়া আইডি ব্যবহার করে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কিংবা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এদের নিয়োগ দেওয়া হয়। একেকজন মানুষ ১০ থেকে ২০টি ভুয়া আইডি নিয়ন্ত্রণ করে। নির্দেশ পাওয়ামাত্রই তারা দল বেঁধে নির্দিষ্ট কোনো লিংকে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রযুক্তিগতভাবে নিখুঁত বট না হলেও, সাধারণ মানুষের কাছে এরা ‘বটবাহিনী’ হিসেবেই পরিচিত।
বটবাহিনী সাধারণত তিনটি প্রধান কৌশলে সাইবার দুনিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন জনমতের দিক পরিবর্তন: কোনো ঘটনা ঘটার পর মুহূর্তের মধ্যে শত শত ইতিবাচক বা নেতিবাচক মন্তব্য করে এরা সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনাকে ভুল পথে চালিত করে।
চরিত্রহনন ও কুৎসা রটনা: কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্মানহানি করতে এদের লেলিয়ে দেওয়া হয়। হাজার হাজার ভুয়া আইডি থেকে যখন একই ভাষায় গালি বা অপবাদ দেওয়া হয়, তখন সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে সেটাকেই সত্য বলে ধরে নেয়।
কোঅর্ডিনেটেড ইনঅথেনটিক বিহেভিয়ার (CIB): মেটা বা ফেসবুকের ভাষায় একে সংঘবদ্ধ ভুয়া আচরণ বলা হয়। কোনো পেজ বা আইডি বন্ধ করার জন্য এরা একসঙ্গে হাজার হাজার ‘রিপোর্ট’ মারে। যা দেখে ফেসবুকের শক্তিশালী অ্যালগরিদম বিভ্রান্ত হয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই আইডিটি ব্লক করে দেয়।
পেশাদার উপায়ে বট শনাক্ত করার কিছু সহজ লক্ষণ রয়েছে। এই লক্ষণের অস্বাভাবিক গতি হলো এই যে, কোনো নিউজ বা পোস্ট পাবলিশ হওয়ার মাত্র ৫ সেকেন্ডের মধ্যে যদি ১০০ বা তার বেশি কমেন্ট চলে আসে, তবে নিশ্চিতভাবেই বুঝা যায় যে সেটি বটের কাজ। একজন মানুষের পক্ষে এত দ্রুত পড়ে কমেন্ট করা অসম্ভব।
হুবহু একই কমেন্ট: যদি দেখা যায় ১০-১৫ জন আলাদা মানুষের আইডির কমেন্ট একদম একই, তবে সেটি বটের কারসাজি।
অসার প্রোফাইল: এসব আইডিতে কোনো ব্যক্তিগত জীবন বা আসল পরিচয় থাকে না। প্রোফাইল পিকচারে থাকে কোনো সেলিব্রিটি, ফুল বা পাখির ছবি। টাইমলাইনে নিজস্ব কোনো পোস্ট থাকে না, কেবল অন্যের পোস্ট শেয়ার করা থাকে এবং তাদের ফ্রেন্ডলিস্ট বা ফলোয়ার সংখ্যায় চরম অস্বাভাবিকতা দেখা যায়।
রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য কেন এটি বড় হুমকি?
বটবাহিনী বর্তমান যুগে সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। এরা অনায়াসে সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। সরকারের কোনো ভালো সিদ্ধান্তকে এরা পরিকল্পিতভাবে বিতর্কিত করে তোলে। কোনো রাজনৈতিক ঘটনা বা সংবেদনশীল সংবাদ প্রকাশের পর মুহূর্তেই যখন হাজার হাজার অভিন্ন মন্তব্য ও একই সুরের প্রচারণা চোখে পড়ে, তখন সাধারণ ব্যবহারকারীরা মনে করেন—সমগ্র সমাজই হয়তো এই মতের পক্ষে।
বাস্তবে এই কৃত্রিম ঢেউ মানুষের মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট’ (Bandwagon Effect) এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের ভাষায় এর নাম ‘অ্যাস্ট্রোটার্ফিং’ (Astroturfing); অর্থাৎ কৃত্রিম উপায়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি করা, যাতে মনে হয় এটিই স্বতঃস্ফূর্ত জনমত।
এটি এক চরম ডিজিটাল প্রতারণা। এমনকি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাঠপর্যায়ে ‘মব’ বা গণপিটুনির পরিস্থিতি তৈরি করার আগে, সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে বিতর্কিত ও আক্রমণযোগ্য করে তোলার কাজটিও এই বট দিয়ে সম্পন্ন করা হয়।
আমাদের সমাজে ‘ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি’ বা তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি এখনো দুর্বল। ফলে এই বটনির্ভর অপপ্রচার খুব সহজেই মানুষের আবেগ, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সামাজিক বিভাজনকে উসকে দিচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে এই নোংরা কৌশল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে; যেখানে প্রথমে ‘ডিপফেক’ বা বিভ্রান্তিকর প্রযুক্তির মাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি করা হয় এবং পরে সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য করতে বটবাহিনী লেলিয়ে দেওয়া হয়।
উত্তরণের উপায়: কী করা জরুরি?
গণতন্ত্র শুধু ভোটের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এর মূল ভিত্তি হলো মুক্ত মতপ্রকাশ, সঠিক তথ্য এবং সচেতন নাগরিক। হরতাল, সহিংসতা বা প্রতিপক্ষের কণ্ঠরোধ যেমন গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর, কৃত্রিম জনমত তৈরির এই ডিজিটাল সংস্কৃতিও সমান বিপজ্জনক।
এই বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেতে এখনই তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
১. প্রযুক্তি জায়ান্টদের জবাবদিহিতা: মেটা (ফেসবুক), গুগলসহ বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে বাংলা ভাষা ও আমাদের স্থানীয় সামাজিক বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশকে এখনই এই প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করতে হবে এবং তারা যেন বাংলাদেশে স্থানীয় অফিস স্থাপন করে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
২. কঠোর ও কার্যকর আইন: সংঘবদ্ধ ডিজিটাল অপপ্রচার, ভুয়া তথ্য ছড়ানো এবং ট্রল ফার্মের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ও সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। জনমত যদি এভাবে কৃত্রিমভাবে প্রভাবিত হতে থাকে, তবে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার মুখ থুবড়ে পড়বে।
৩. ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সচেতনতা। স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচি থেকেই শিক্ষার্থীদের তথ্য যাচাই (Fact-check), সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণের শিক্ষা দিতে হবে।
সরকারকে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে—এই দেশে কি জনগণের অবাধ ও সত্য তথ্যের প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে, নাকি রাষ্ট্র ও সমাজ এই অপ্সরা বটবাহিনীর কাছে চিরতরে জিম্মি হয়ে থাকবে?