কিন্তু সেই ভাবনা এখন ত্যাগ করেছেন ট্রাম্প। নিজের দ্বিতীয় মেয়াদে পুরোপুরি এক যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট বনে গেছেন তিনি। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। লাতিন আমেরিকার দেশটির সামরিক শক্তিমত্তায় পিছিয়ে থাকায় প্রতিরোধ গড়তে পারেনি। একপ্রকার ‘আত্মসমর্পণ’ করেছে।
সেখান থেকে পাওয়া আত্মবিশ্বাসের জোরে তিনি ইরানেও হামলা চালিয়ে বসেছেন। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বারবার বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের হামলা চালানোর কোনও সম্ভাবনা নেই। এরপরও তিনি আরেক যুদ্ধবাজ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্ররোচণায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালিয়ে বসেছেন ট্রাম্প।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই যুদ্ধের কোনও লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা যুদ্ধ শুরুর আগে ও পরে বলে এসেছেন, তারা ইরানের ধর্মীয় সরকার উৎখাত এবং পরমাণু কাঠামো ধ্বংস করতে চান।
কিন্তু যুদ্ধের প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনও এই দুই লক্ষ্য অর্জনে ন্যূনতম অগ্রগতিও সাধিত হয়নি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে যুদ্ধের প্রথমদিনই হত্যা করলেও তাতে ইরানের সরকার পতনের কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি। দেশটি ইতোমধ্যে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে সিনিয়র খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে নির্বাচিত করেছে।
একই সঙ্গে চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরানে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দেখা গেলেও এখন দেশটির নতুন করে ঐক্য তৈরি হয়েছে। মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের কদর্য রূপ দেখে বিরোধীরাও এখন দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই ইরানের বড় শহরগুলোতে সরকারের পক্ষে ব্যাপক জমায়েত হচ্ছে। এখন মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা, গণমাধ্যম এবং বিশ্লেষকরা প্রকাশ্যেই বলছেন, ইরানে সরকার পতনের ন্যূনতম সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।
এদিকে ইরানের পরমাণু সক্ষমতা ধ্বংস করতে দেশটির বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। কিন্তু এতে ইরানের ৪৫০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কোনও ক্ষতিসাধন হয়েছে বলে জানা যায়নি। উপায়ান্তর না দেখে ইরানে বিশেষ বাহিনী পাঠিয়ে ইউরেনিয়াম জব্দের ‘অপশন’ও বিবেচনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু এতে ব্যাপক নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকায় এই পরিকল্পনা আপাতত গ্রিন সিগন্যাল পাচ্ছে না।
এককথায়, ইরানের পরমাণু কাঠামো ধ্বংসের যে স্বপ্ন ট্রাম্প দেখেছিলেন, তা এখনও সুদূরপরাহত।
এ ছাড়া ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবস্থা, নৌ ও বিমানবাহিনী ধ্বংস নিয়ে বহু উচ্চকিত মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প ও তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। কিন্তু এখনও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একচ্ছত্র আধিপত্য আর উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ ও ইসরায়েলে হামলা প্রমাণ করছে, তাদের সামরিক শক্তি অক্ষত রয়েছে। ইরান এবং তাদের লেবানিজ মিত্র হিজবুল্লাহ বলেছেন, এ যাত্রায় তারা দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।
প্রধান দুই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ ট্রাম্প ঘরে-বাইরে এখন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন। অবস্থা এতটাই বেগতিক যে, মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধেই ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে তার প্রশাসন। যুদ্ধের ইতিবাচক কাভারেজ না দিলে সংবাদমাধ্যমগুলোর লাইসেন্স আটকে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন ফেডারেল কমিউনিকেশন কমিশনের চেয়ারম্যান ব্রেন্ডান কার।
ট্রাম্প প্রশাসনের এতটা অস্থিরতার পেছনে মূল কারণ–একে তো যুদ্ধের সাফল্য অনিশ্চিত, তার ওপর হরমুজ সংকট নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ইরানে সরকার উৎখাত বা পরমাণু সক্ষমতা ধ্বংস করা বাদ দিয়ে এখন হরমুজ প্রণালি ‘মুক্ত’ করতে মনোযোগ দিতে হচ্ছে ট্রাম্পকে। নিজেদের সামরিক শক্তিমত্তা নিয়ে উচ্চবাচ্য করা মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখন বুঝতে পেরেছেন, তার বাহিনীর পক্ষে একা হরমুজ প্রণালি মুক্ত করা সম্ভব নয়। তাই ট্রুথ সোশ্যালে একের পর এক পোস্ট দিয়ে মিত্রদের সমর্থন চাচ্ছেন।
কিন্তু মিত্ররা তার আহ্বানে সাড়া দিচ্ছেন না। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক অভিযানে নিজ থেকেই যোগ দেয়া ইউরোপে গ্রিনল্যান্ড-কাণ্ডের পর এ যাত্রায় ট্রাম্পের কথায় কান দিচ্ছে না। উপায়ান্তর না দেখে মধ্যপ্রাচ্যে আড়াই হাজার মেরিন সেনা পাঠিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু তারা কতটা কী করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
কারণ, চীন ও রাশিয়ার গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং নিজেদের নিপুণ যুদ্ধ পরিকল্পনার জোরে ইরান এখন নিখুঁতভাবে হামলা চালাচ্ছে। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ঝাঁক মোকাবিলা করতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এবং ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্লান্ত। ফুরিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষার সরঞ্জামও। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে থাড ক্ষেপণাস্ত্র এনে মধ্যপ্রাচ্যে কাজে লাগাতে হয়েছে তাদের।
সবমিলিয়ে ইরান যুদ্ধে এক বিব্রতকর পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প। একদিনে প্রধান দুই লক্ষ্য অর্জন ব্যর্থতা, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি সংকটের জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা বিঘ্নিতের সম্ভাবনা তাকে কঠিন বিপদে ফেলেছে। এই সংকটের মধ্যে বাণিজ্য অংশীদারদের রাশিয়ার জ্বালানি ক্রয়ের ‘অনুমতি’ দিয়ে কৌশলগত পরাজয় বরণ করেছেন তিনি।