২০০২ সালের পর দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখা হয়নি সাম্বার দেশের। গত দুই দশকে প্রতিটি আসরেই কোনো না কোনো ইউরোপীয় শক্তির কাছে ব্রাজিলের বিদায় ঘটেছে ট্র্যাজিক নাটকের মতো। ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, বেলজিয়াম কিংবা ক্রোয়েশিয়া প্রতিটি ম্যাচই যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল ব্রাজিলের কৌশলগত দুর্বলতা। তবে এবার ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিল লড়ছে এক ভিন্ন বাস্তবতায়। নিজেদের হারানো আধিপত্য ফিরে পেতে হেক্সা মিশনের দায়িত্ব তারা তুলে দিয়েছে ইতিহাসখ্যাত ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তির হাতে। ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো বিদেশি কোচের অধীনে বিশ্বকাপে খেলছে সেলেসাওরা। ক্লাব ফুটবলে সাফল্যের এভারেস্টে চড়া এই ট্যাকটিশিয়ানের হাত ধরেই এবার নতুন স্বপ্নের জাল বুনছে ব্রাজিলিয়ানরা।
ব্রাজিল ও মরক্কোর ফুটবলীয় ইতিহাস খুব একটা দীর্ঘ নয়। বিশ্বকাপে দুই দলের একমাত্র দেখা হয়েছিল ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে, যেখানে রোনালদো-রিভালদোদের ব্রাজিল জিতেছিল ৩-০ ব্যবধানে। তবে অতীতের সেই পরিসংখ্যান দিয়ে বর্তমান মরক্কোকে মাপতে যাওয়া হবে মস্ত বড় ভুল। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে রূপকথার জন্ম দিয়ে সেমিফাইনালে ওঠা ‘আটলাস লায়ন্স’রা এখন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সমীহ জাগানিয়া পরাশক্তি।
সাম্প্রতিক সময়ে নানা অস্থিরতা ও ইনজুরি জর্জরিত ব্রাজিল দল আনচেলত্তির ছোঁয়ায় এখন অনেকটাই সুসংহত। গোলরক্ষক আলিসন বেকারের কণ্ঠেও ঝরেছে সেই আত্মবিশ্বাস। এবার ব্রাজিলের আক্রমণভাগের ব্যাটন থাকছে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া এবং বিস্ময়বালক এন্দ্রিকের কাঁধে। মাঝমাঠে কাসেমিরো ও ব্রুনো গুইমারসের অভিজ্ঞতা এবং রক্ষণে মারকুইনহোসের নেতৃত্ব দলটিকে ভারসাম্য দিচ্ছে। তাছাড়া, প্রস্তুতি ম্যাচে মিসরকে ২-১ গোলে হারিয়ে মানসিকভাবে চাঙ্গা রয়েছে দল। অন্যদিকে, মরক্কো এবারও বড় দলগুলোকে চমকে দিতে প্রস্তুত।
দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের জমাট রক্ষণ আর চোখের পলকে করা কাউন্টার অ্যাটাক। বিশ্বসেরা রাইট-ব্যাক আশরাফ হাকিমি, মাঝমাঠের ইঞ্জিন সুফিয়ান আমরাবাত আর রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাহিম দিয়াজের মতো তারকারা যেকোনো রক্ষণভাগ চূর্ণ করতে সক্ষম। গোলপোস্টে ইয়াসিন বুনুর দেয়াল ভাঙা ব্রাজিলের জন্য সহজ হবে না।
কাগজে-কলমে গ্রুপ ‘সি’-তে ব্রাজিল ও মরক্কোই সবচেয়ে শক্তিশালী দল (গ্রুপের বাকি দুই দল স্কটল্যান্ড ও হাইতি)। তাই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াইয়ে এই ম্যাচের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্লেষকদের মতে, বল পজিশন ধরে রেখে আনচেলত্তির দল আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললেও মরক্কো ওত পেতে থাকবে গতিময় পাল্টা আক্রমণের জন্য। ভিনিসিয়ুসের গতি বনাম হাকিমির ট্যাকলিংয়ের দ্বৈরথ ম্যাচটির ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে।
বাংলাদেশি ফুটবল ভক্তদের জন্য ভোর ৪টার এই ম্যাচ কেবল একটা ফুটবল ম্যাচ নয়; বরং চিরচেনা সেই ফুটবলীয় আবেগের পুনর্জাগরণ। আনচেলত্তির মগজাস্ত্রে হলুদ জার্সিধারীরা জয়ে ফিরবে, নাকি মরক্কোর লড়াকু মানসিকতা আবারও কোনো অঘটনের জন্ম দেবে তা দেখতে চোখ রাখতে হবে মেটলাইফ স্টেডিয়াম থেকে সরাসরি সম্প্রচারে টিভি পর্দায়।