আজ ২১ জুন, বিশ্ব ‘বাবা দিবস’। বছরের বাকি ৩৬৪ দিন যে মানুষটা নিজের সবটুকু ক্লান্তি, অবহেলা আর দীর্ঘশ্বাসকে এক চিলতে হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখেন, এই একটা দিন অন্তত তার সেই চেনা ছায়ার অচেনা ত্যাগগুলোকে নতুন করে ভালোবাসার দিন। পরম শ্রদ্ধায় ও আবেগে জড়িয়ে ধরে বলার দিন, ‘বাবা, তুমিই আমার দেখা সেরা সুপারহিরো।’
মা যদি হন স্নেহের নদী, তবে বাবা হলেন সেই নদীর সুউচ্চ বাঁধ। যিনি নিজে রোদে পুড়ে, ঝড়-ঝাপটা সয়ে পুরো পরিবারকে আগলে রাখেন এক মস্ত বটবৃক্ষের মতো। আমাদের চেনা সমাজব্যবস্থায় মায়েদের আবেগ যতটা প্রকাশ্য, বাবাদের ভালোবাসা ঠিক ততটাই যেন আড়ালে ঢাকা। একটু গম্ভীর ও মিতভাষী।
বাবা মানেই এক অদ্ভুত শাসন, আবার পকেট ফাঁকা করে সন্তানের অবাস্তব আবদারগুলো এক নিমেষে পূরণ করার জাদুকর। ছেলেবেলায় মেলা থেকে কিনে আনা সেই রঙিন কাগজের নৌকো, প্লাস্টিকের গাড়ি কিংবা স্কুলের প্রথম দিনের নতুন খাতা-কলম; এগুলো কিন্তু বাবার ওই ক্ষয়ে যাওয়া মানিব্যাগটারই এক একটি নীরব কোরবানি। নিজের জন্য একটা নতুন শার্ট কেনার বাজেট যিনি প্রতি ঈদে বা উৎসবে হেসে কেটেকুটে বাদ দেন, অথচ সন্তানের পছন্দের ব্র্যান্ডের জামাটা ঠিকই অভাবের সংসারেও এনে হাজির করেন, তিনিই তো বাবা।
বাবার ভালোবাসার কোনো লিখিত দলিল থাকে না, তা প্রকাশ পায় চশমার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্লান্ত চোখে আর সন্তানের সাফল্যে গোপনে মোছা আনন্দের অশ্রুতে। পৃথিবীর বেশিরভাগ বাবাই তাদের সন্তানকে মুখে বলে বোঝাতে পারেন না যে, তারা কতটা ভালোবাসেন। মায়েরা যেমন খুব সহজে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে বুকের মধ্যে আগলে নিতে পারেন, বাবারা সেই ব্যাকরণে বড্ড আনাড়ি। তাদের ভালোবাসার প্রকাশটা একটু ভিন্ন, কিছুটা আড়াল করা।
বাড়ি ফিরতে একটু রাত হলে ড্রয়িংরুমের অন্ধকার থেকে ভেসে আসা গম্ভীর গলার ‘এত দেরি হলো কেন?’—এই প্রশ্নের ভেতরে যে এক বুক তীব্র উৎকণ্ঠা লুকিয়ে থাকে, তা হয়তো সন্তানরা অনেক দেরিতে বোঝে। আবার পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো হলে কিংবা চাকরির প্রথম মাইনে পেলে বন্ধুদের আড্ডায় চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বুক ফুলিয়ে ‘আমার ছেলে’ বা ‘আমার মেয়ে’ বলে গর্ব করার যে অকৃত্রিম আনন্দ, সেটাই বাবার ভালোবাসার ভাষা। মাঝরাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে, তখন আলতো পায়ে সন্তানের ঘরের দরজায় এসে মশারীটা ঠিক করে দেয়া কিংবা মাথায় হাত না রেখেই দূর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার মঙ্গল কামনা করা—এটাই একজন বাবার চিরন্তন রূপ।
সন্তান যখন কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা রাখে, বাবার সঙ্গে দূরত্বের দেয়ালটা যেন অলক্ষ্যেই আরও একটু চওড়া হতে শুরু করে। একসময়ের যে বাবা কাঁধে চড়িয়ে পুরো মেলা কিংবা শহর দেখাতেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সাথেই যেন আমাদের সবচেয়ে কম কথা হয়। আমাদের তখন বন্ধু হয়, ক্যারিয়ার হয়, ব্যস্ত দুনিয়ায় ডানা মেলে ওড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগে। কিন্তু খেয়াল করে দেখবেন, ড্রয়িংরুমে বসে একা একা পত্রিকা পড়ার আড়ালে কিংবা টিভির রিমোট ঘোরানোর ফাঁকে তার চশমার ওপর দিয়ে ভেসে আসা চোখ দুটো সারাক্ষণ আপনার গতিবিধির ওপরই নজর রাখছে। তিনি শুধু চান, তার সন্তান যেন এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে কোনো হোঁচট না খায়।
আর ঠিক যখন আমরা নিজেদের ক্যারিয়ার, সংসার আর ব্যস্ত দুনিয়ায় থিতু হতে শুরু করি; তখনই আমাদের অলক্ষ্যে সেই বিশাল বটবৃক্ষটার পাতা ঝরতে শুরু করে। লাঠির ওপর ভর দেয়া, চুলে পাক ধরা, আর ক্ষয়ে যাওয়া চশমার কাচ ভেদ করে তাকিয়ে থাকা বৃদ্ধ মানুষটাকে তখন বড্ড একা-নিঃসঙ্গ মনে হয়।
অনেকেই হয়তো ক্যারিয়ারের প্রয়োজনে কিংবা জীবনের তাগিদে বাবার থেকে শত-সহস্র মাইল দূরে প্রবাসে বিভূঁইয়ে পড়ে আছেন। আবার অনেকের বাবা হয়তো পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেছেন ওপারের চিরশীতল কোনো ঠিকানায়; যেখান থেকে আর কোনোদিন কোনো শাসন বা ভালোবাসার ভারী ডাক আসবে না। যারা বাবাকে হারিয়েছেন, তারাই কেবল বোঝেন মাথার ওপর থেকে ওই ছাদটুকু সরে গেলে তপ্ত রোদের উত্তাপ কতটা তীব্র ও নির্মম হয়। তখন কোটি টাকা খরচ করলেও আর সেই নিঃস্বার্থ বটবৃক্ষের ছায়া কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।
এই বিশেষ দিনটি কেবল ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে একটা পুরোনো ছবি পোস্ট করা কিংবা ‘হ্যাপি ফাদার্স ডে’ স্ট্যাটাস দেয়ার আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই যেন সীমাবদ্ধ না থাকে। যদি বাবা বেঁচে থাকেন, কাছে থাকেন; আজই সব কাজ ফেলে তার পাশে গিয়ে বসুন। তার ওই খসখসে, শিরা ওঠা শক্ত হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে একটু চাপ দিয়ে বলুন ‘বাবা, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। তোমার সন্তান হতে পেরে আমি ধন্য।’ যদি দূরে থাকেন, ফোন করুন। শুধু ‘কেমন আছো’ না জিজ্ঞেস করে তার সঙ্গে পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলো নিয়ে একটু গল্প করুন। হয়তো তিনি হঠাৎ এই আবেগে কিছুটা লজ্জায় মুখটা ঘুরিয়ে নেবেন, কিংবা একটু হেসেই এড়িয়ে গিয়ে বলবেন ‘ধুর পাগল!’। বিশ্বাস করুন, বুকের ভেতর জমে থাকা তার বছরের পর বছর ধরে চলা সব ক্লান্তি আর একাকীত্ব ওই এক মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উড়ে যাবে।
পৃথিবীর সব বাবাদের রাতের ঘুমটা ভালো হোক, তাদের আজীবন করে যাওয়া ত্যাগের সঠিক মূল্যায়ন হোক। প্রতিটি ঘরের গল্পে বাবারা চিরকাল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ‘সুপারহিরো’ হয়েই বেঁচে থাকুন। বিশ্ব বাবা দিবসে পৃথিবীর সকল বাবার প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা ও অন্তহীন ভালোবাসা।
বাবা দিবস কেমন করে এলো?
প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার পালন করা হয় বাবা দিবস। বাবার প্রতি সম্মান জানাতে প্রায় ৮৭টি দেশে এই দিনটি পালন করা হয়। এই দিবস প্রথম পালন করা হয় ১৯১০ সালে। এই উদযাপনের নেপথ্যে রয়েছেন একজন নারী। তার নাম স্মার্ট ডড। তিনি খুব অল্প বয়সে তার মাকে হারান। তার বাবা ছিলেন একজন সৈনিক। বিপত্নীক মানুষটি খুব কষ্ট করে তার সন্তানদের বড় করেন। বাবার প্রতি সম্মান প্রকাশ করতেই সেনোরা ও তার ভাইবোনেরা মিলে বাবা দিবস পালনের উদ্যোগ নেন। এরপর তারা স্থানীয় প্রশাসন ও গির্জার দ্বারস্থ হন। এরপর তাদের সম্মিলিত উদ্যোগে প্রথমবারের মতো বাবা দিবস উদযাপন করা হয়। সেনোরা চেয়েছিলেন ৫ জুন তার বাবার জন্মদিনে দিবসটি পালন করতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জুন মাসের তৃতীয় রোববার বেছে নেয়া হয়।
এমনটাও শোনা যায় যে, সেনোরা পালনের আগেই আমেরিকায় বাবা দিবস পালন করা হয়। সেই তারিখ ছিল ১৯০৮ সালের ৫ জুলাই। সেদিন ভার্জিনিয়ার ফেয়ারমন্টের এক গির্জায় বাবা দিবস পালন করা হয়। তবে সেই উদযাপনের কথা জানা ছিল না সেনোরার। বাবা দিবসকে সরকারি স্বীকৃতি এবং ছুটির দিন হিসেবে পালনের জন্য প্রচার চালিয়ে গেছেন তিনি। ১৯১৩ সালে মার্কিন সংসদে বাবা দিবসকে ছুটির দিন ঘোষণা করা সংক্রান্ত একটি বিল উথ্থাপিত হয়। যদিও তখন তা আলোর মুখ দেখেনি।
শেষ পর্যন্ত ১৯৬৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন বাবা দিবসকে ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। মার্কিন কংগ্রেস ১৯৭০ সালে সরকারি নির্দেশ জারি করে জানায়, প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার বাবা দিবস পালন করা হবে। ওইদিন সরকারি সব দপ্তরে মার্কিন পতাকা ওড়ানো হবে, নানাবিধ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। এরপর ১৯৭২ সালে রিচার্ড নিক্সন মার্কিন প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বাবা দিবস উদযাপন শুরু হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ব্রিটেন, ভারত, চিলি, পাকিস্তান, জাপান, দক্ষিণ আফ্রিকা, মায়ানমারেও এই দিবস পালন করা শুরু হয়। বেলজিয়াম ও অস্ট্রিয়ায় বাবা দিবস পালন করা হয় জুন মাসের দ্বিতীয় রোববার। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম রোববার পালন করা হয় অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে। এদিকে, ৫ ডিসেম্বর বাবা দিবস পালন করা হয় থাইল্যান্ডে।
বেশিরভাগ দেশে জুন মাসের তৃতীয় রোববারই বাবা দিবস। এই দিবসকে ঘিরে থাকে নানা আয়োজন। বিভিন্ন বিক্রয় প্রতিষ্ঠান এই দিবস উপলক্ষে কেনাকাটায় ছাড় দিয়ে থাকে। যদি মা কিংবা বাবার জন্য আলাদা দিবসের প্রয়োজন হয় না, তবু একটি দিন তাদের জন্য বিশেষ করে তোলার প্রচেষ্টাকেও ছোট করে দেখার উপায় নেই।