কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, এক খাতের নামে নেওয়া ঋণ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কি না কিংবা ভুয়া ও বেনামি ঋণের মাধ্যমে অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হবে। ব্যাংকিং খাতে এ প্রক্রিয়া ‘এন্ড ইউজ মনিটরিং’ নামে পরিচিত।
শিগগিরই এ বিষয়ে নীতিমালা জারি করে ব্যাংকগুলোকে তা পরিপালনের নির্দেশ দেওয়া হবে। বহিঃনিরীক্ষকের প্রতিবেদনে কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে খেলাপি ঋণ বাড়ার অন্যতম কারণ বেনামি ও ভুয়া ঋণ। অনেক ক্ষেত্রে জামানতের সম্পদের মূল্য অতিরিক্ত দেখিয়ে ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আবার ব্যবসার নামে ঋণ নিয়ে জমি কেনা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ কিংবা বিদেশে পাচারের ঘটনাও ঘটেছে। এসব অনিয়মে ব্যাংকের কিছু পরিচালক ও কর্মকর্তার যোগসাজশ থাকার অভিযোগও রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ঋণের অর্থের ব্যবহার যাচাই করা হলে এ ধরনের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এতে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা উভয় পক্ষের জবাবদিহিও বাড়বে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও বড় ঋণের ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। ভারতে বড় ঋণ বিতরণের পর চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ‘ইউটিলাইজেশন রিপোর্ট’ নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ঋণের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সন্দেহ হলে ফরেনসিক অডিটও করা হয়।
এদিকে বড় ঋণের অনিয়ম খুঁজে বের করতে এরই মধ্যে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত মে মাসে ব্যাংকগুলোকে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ২০ কোটি টাকা বা তার বেশি বিতরণ ও পুনঃতফশিল করা ঋণের তথ্য দিতে বলা হয়। এতে ঋণগ্রহীতা, ঋণের খাত ও পুনঃতফশিলসংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়।
তথ্য যাচাইয়ে কয়েকটি ব্যাংকে অনিয়মের সন্ধানও পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকে বেনামি ঋণ এবং পর্যাপ্ত ডাউনপেমেন্ট ও জামানত ছাড়াই বড় ঋণ পুনঃতফশিলের বিষয় উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সতর্ক করে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, একদিকে বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা কমে ব্যাংকগুলোতে উদ্বৃত্ত তারল্য বাড়ছে, অন্যদিকে খেলাপি ও দুর্দশাগ্রস্ত ঋণও বাড়ছে। গত জুন শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের শেষে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে ঋণের মান খারাপ হওয়া ঠেকাতে ঋণের অর্থ ব্যবহারের পর্যায় থেকেই নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।