দুই বছর আগে ঠিক এই সময়ে রাজপথে নেমেছিল লাখো মানুষ। শিক্ষার্থীদের হাতে ধরা প্ল্যাকার্ড, স্লোগানে মুখরিত সড়ক, টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট, গুলির শব্দ আর রক্তে রঞ্জিত পথ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশ-পরবর্তী সময়ের অন্যতম বড় গণঅভ্যুত্থান। সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন ঘটে টানা দেড় দশকের আওয়ামী লীগ সরকারের।
৫ আগস্ট, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি। শহিদদের স্মরণ, আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা আর নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নকে সামনে রেখে দিনটি পালন করবে দেশ। তবে স্মরণ আর উদযাপনের পাশাপাশি আজও উচ্চারিত হচ্ছে একটি প্রশ্ন; যে স্বপ্ন নিয়ে মানুষ রাজপথে নেমেছিল, দুই বছর পর তার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?
আন্দোলনের বিস্ফোরণ
শুরুটা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে। জুনজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে চলছিল বিক্ষোভ। কিন্তু খুব দ্রুত সেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকারের বৃহত্তর প্রশ্নে।
১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদের মৃত্যু যেন আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তার রক্তাক্ত শরীর হয়ে ওঠে প্রতিবাদের প্রতীক। এরপর একে একে দেশের বিভিন্ন শহরে মানুষ রাজপথে নেমে আসে।
ইন্টারনেট বন্ধ হয়েছে, কারফিউ জারি হয়েছে, গুলি ছোড়া হয়েছে। কিন্তু রাজপথ ফাঁকা হয়নি। স্কুলের শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ, শ্রমিক, রিকশাচালক, চিকিৎসক, শিক্ষক, শিল্পী, ব্যবসায়ী, গৃহিণী—সমাজের প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনের অংশ হয়ে ওঠেন। ৩ আগস্ট ঘোষিত একদফা দাবি এবং ৫ আগস্টের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত বদলে দেয় দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা।
ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে উঠেছে স্মৃতিগুলো
দুই বছর পর সেই দিনগুলোর স্মৃতি শুধু মানুষের মনে নয়, সংরক্ষিত হচ্ছে রাষ্ট্রীয়ভাবেও। জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে স্থান পেয়েছে আন্দোলনের সময় ব্যবহৃত ব্যানার, গ্রাফিতি, আলোকচিত্র, ব্যক্তিগত স্মারক এবং শহিদদের বিভিন্ন নিদর্শন। যা আজ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এগুলো শুধু ইতিহাসের দলিল নয়; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংগ্রামের সাক্ষ্য।
দেশজুড়ে শহিদদের স্মরণে আয়োজন করা হচ্ছে আলোচনা, প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অনেক পরিবার আজও হারানো সন্তান, ভাই কিংবা স্বজনের স্মৃতি বুকে নিয়ে দিনটি পালন করছে।
কী বদলেছে দুই বছরে?
অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এসেছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। সংস্কার প্রক্রিয়া শেষে অনুষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় নির্বাচন। বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রশাসন ও বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার, জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে একাধিক পদক্ষেপ।
তবে বাস্তবতার আরেকটি ছবিও রয়েছে।
নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক সংস্কারের ধীরগতি নিয়ে এখনো আলোচনা-সমালোচনা চলছে। আন্দোলনের সময় উচ্চারিত অনেক প্রত্যাশা বাস্তবায়নের পথ এখনো দীর্ঘ।
সবচেয়ে বড় অর্জন
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের ঐক্য। রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়েছিল একটি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে—একটি জবাবদিহিমূলক, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দাবিতে।
এই আন্দোলন দেখিয়েছে, জনগণের ইচ্ছার চেয়ে বড় কোনো শক্তি নেই। রাষ্ট্র যখন নাগরিকের কণ্ঠস্বর শুনতে ব্যর্থ হয়, তখন ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে রাজপথে নেমে আসা মানুষই।
তারিখ পেরিয়ে অঙ্গীকার
৫ আগস্ট শুধু অতীতের স্মরণ নয়; এটি ভবিষ্যতেরও প্রতিশ্রুতি। এটি মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা কখনোই স্থায়ীভাবে অর্জিত কোনো বিষয় নয়; এগুলো রক্ষা করতে হয় প্রতিনিয়ত।
দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, আহতদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারই হোক জাতির সবচেয়ে বড় প্রত্যয়। রক্তে লেখা ‘৩৬ জুলাই’ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক চলমান প্রেরণা।